জামায়াত তোষণ ও নারীবিদ্বেষের অভিযোগে এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির অন্যতম শীর্ষ নেত্রী সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে এনসিপি থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তিনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন, নির্বাচনে দলীয় নীতি বিসর্জন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নারীর অবদানকে কোণঠাসা করা এবং দলীয় কাউন্সিলের তোয়াক্কা না করে স্বৈরাচারী উপায়ে দল পুনর্গঠনের মারাত্মক অভিযোগ তুলে তিনি দল ত্যাগ করেন।

সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি দলের অভ্যন্তরে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, নীতিগত বা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই জামায়াত মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়। তিনি এনসিপির ভেতরের ফোরামগুলোতে দীর্ঘ ১১ মাস ধরে লিখিত প্রস্তাব ও মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলেন। তবে দলটি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রারম্ভিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হওয়ায় তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এনসিপি সংস্কারের কথা বললেও কার্যত একটি অগণতান্ত্রিক ও পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর লেজুড়বৃত্তিতে লিপ্ত হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

পদত্যাগপত্রে মূলত চারটি মৌলিক বিষয়ে এনসিপির নীতিগত ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেন এই রাজনৈতিক নেত্রী। প্রথমত, ‘সংস্কারের বন্ধু হিসেবে জামায়াত’ শিরোনামে তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান, আইন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে মৌলিক সংস্কার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল, জামায়াত তার একটিকেও নিজের রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না। জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুযোগ নিয়ে মূলত একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য ক্ষমা না চাওয়ার মানসিকতা থেকেই তাদের এই ফ্যাসিবাদী ভিত্তি স্পষ্ট হয়। এনসিপি এই শক্তিকে সঙ্গ দেওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ দলটির সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপির ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। সামান্তা শারমিন উল্লেখ করেন, ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ বা ১৯৯০ সালের মতো ২০২৬ সালের নির্বাচনটিও একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে এনসিপি সেই সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের মতো অগণতান্ত্রিক ও পুরোনো নির্বাচনী কৌশলে অংশ নিয়ে বড় দলের লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও প্রকাশ করেন যে, শহীদ ওসমান হাদির মর্মান্তিক মৃত্যুকে অতি-পুরোনো ও অগণতান্ত্রিক জোট গঠনের পক্ষে অযৌক্তিক অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তৃতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা ও অধিকারের বিষয়ে এনসিপির চরম অবহেলার কথা উল্লেখ করেন সামান্তা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দেশের নারী সমাজ ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে রক্ষাকবচ হিসেবে এগিয়ে নিয়ে গেলেও বিজয়ের পর এনসিপি রক্ষণশীল ও নারীবিরোধী শক্তির সহযোগী হয়ে উঠেছে। দেশের ৫১ শতাংশ জনগোষ্ঠী নারী হলেও এনসিপি দলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং নীতিগত ইতিবাচক বৈষম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিজয়ের পর নারীর মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অস্বীকার করে এনসিপি গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকেই সংকুচিত করেছে।

চতুর্থত, দলীয় কাউন্সিলের তোয়াক্কা না করে পুনর্বার আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এনসিপি চরম অগণতান্ত্রিক নজির স্থাপন করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দলের নির্ধারিত কাউন্সিল এড়িয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পুরোনো রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। নিজের দলের অভ্যন্তরেই যে দল গণতন্ত্র চর্চা করতে পারে না, তারা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। পদত্যাগের পর সামান্তা শারমিন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, নারীর সমঅধিকার এবং জাতীয় পুঁজির সুরক্ষায় তরুণদের নিয়ে বিভাজনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।