খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী শহর জিজান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। শনিবার, ২৫ জুলাই দুপুরে গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়। সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই হামলার এই দাবি সামনে আসে। তবে হামলাটি ঠিক কোথায় আঘাত হেনেছে, এতে হতাহত বা কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
হুথিদের আনসারুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের বরাতে জানা গেছে, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের পর জিজান এলাকায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে আগুনের সূত্রপাত ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে হয়েছে কি না, কিংবা সেখানে কোনো সামরিক বা বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
হামলার দাবির আগে সৌদি আরব হুথিদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লোহিত সাগরে নৌযান চলাচলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সৌদি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় হুথিরা সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে বর্ণনা করে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
এরই মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জিজান ও ইয়ানবু এলাকার বাসিন্দাদের জন্য স্বল্প সময়ের একটি সতর্কতা জারি করেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করা হলেও কয়েক মিনিট পরই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। পরে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানানো হয়। সতর্কতা জারি ও প্রত্যাহারের ঘটনাটি হামলার দাবিকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা উদ্বেগেরও ইঙ্গিত দেয়।
জিজান সৌদি আরবের ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই এলাকাটি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব অতীতেও অনুভব করেছে। সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার ক্ষেত্রে জিজান ও আশপাশের এলাকাগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়লে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লোহিত সাগরকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার আশঙ্কা বাড়লে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প দীর্ঘ নৌপথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
হুথিরা অতীতে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এসব হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন হওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তার যেকোনো অবনতি আঞ্চলিক অর্থনীতি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
জিজানে হামলার দাবিটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা দেখা দিলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব সহকারে অংশ নিচ্ছে। এই বক্তব্য আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেছে—এমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
জিজানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি সত্য হলে এটি সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে সৌদি সামরিক অভিযান, হুথিদের পাল্টা হুমকি এবং লোহিত সাগরে নৌনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু একই সময়ে চলতে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে হামলার প্রকৃত লক্ষ্য, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা, হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে হুথিদের দাবির পাশাপাশি সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ সূত্রের তথ্যের দিকেই এখন নজর থাকবে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে এর প্রভাব শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে লোহিত সাগরের নৌনিরাপত্তা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে।