খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 27শে কার্তিক ১৪৩২ | ১১ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের নির্দেশ জারি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নভেম্বরে গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবিতে আজ জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর পল্টনে দুপুর ২টায় এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। জামায়াত আগেই জানিয়েছিল, তাদের দাবি মানা না হলে আগামী ১১ নভেম্বর রাজধানীর পরিস্থিতি ভিন্ন আকার ধারণ করবে।
এদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাত দিনের সময়সীমা গতকাল সোমবার শেষ হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের হাতে। বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলোও নিজেদের অবস্থানে অনড়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে কে কার সঙ্গে গোপন বৈঠক করছে, কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে—এ নিয়ে নানা গুঞ্জন ও গুজব।
গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর মধ্যে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বৈঠক হয়েছে—এমন খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘একটি মহল নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া মানেই দেশের সর্বনাশ।’
রাজনীতির এই জটিল ঘূর্ণাবর্তে আগামী ১৩ নভেম্বর কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। ওই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা করতে পারে।
এদিনকে কেন্দ্র করে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের পক্ষ থেকে নানা অপকর্ম চালানো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল সকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল সৃষ্টিকর্তা এই সরকারই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা দলগুলোর মধ্যে এখনকার বিরোধ মূলত এক ধরনের প্রতিযোগিতা ও দর–কষাকষি। শেষ পর্যন্ত মতপার্থক্য থাকবে না, কারণ দলগুলো সমান ঝুঁকিতে আছে। তাদের মধ্যে মতভেদের চেয়ে কৌশলগত পার্থক্যই বেশি। সময়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেউ কেউ মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। এমনও হতে পারে, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে এবং সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকবে না। আবার কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে। যদিও জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, সরকার দলগুলোকে সময় দিয়েছিল কিন্তু সিদ্ধান্ত না আসায় শিগগিরই সরকার বসে সামষ্টিক সিদ্ধান্ত জানাবে।
তিনি আরো বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, উভয় পক্ষের রাজনৈতিক কৌশলগত পার্থক্যই বেশি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য সরকার সাত দিনের সময়সীমা দিয়েছিল, যা ১০ নভেম্বর শেষ হলেও কার্যকর কোনো সমন্বয় হয়নি। বিএনপি এখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবে অনড়। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল সাধারণ নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবিতে সোচ্চার।
বিএনপি মনে করছে, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হলে সরকার চাপের মুখে পড়বে এবং তাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে। অন্যদিকে জামায়াতসহ কয়েকটি দল মনে করছে, নির্বাচনের আগে গণভোট হলে বিএনপি দুর্বল হবে। ফলে উভয় পক্ষ সময়কে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুুবুর রহমানের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর মধ্যে এখন প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি বলেন, গণভোট কবে হবে এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকবে কি না, তা নিয়েই মূল মতভেদ। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই একমত হবে, কারণ দলগুলো সমান ঝুঁকিতে আছে এবং পুনরায় অনিশ্চয়তা কেউ চায় না।
গুঞ্জন রয়েছে, জাতীয় পার্টির হয়ে আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। আবার শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মামলার রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক চাপ কমলে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো এই অবস্থান থেকে সরে আসবে না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সংসদীয় আসন ভাগাভাগির দেনদরবারে পরিণত হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে সবাইকে জোর করে একমত করানো সম্ভব নয়, বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশে নতুন করে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গণ–অভ্যুত্থানের পরও দেশ উল্টো পথে চলছে। ধর্ম ও অভ্যুত্থানের নামে ফ্যাসিবাদী চিন্তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে না পারলে জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তিনি বলেন, সরকারকেই এই সংকটের সমাধান বের করতে হবে এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
অন্যদিকে আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াত নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সরকারকে মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার কঠোরতা দেখালে দলগুলো নরম অবস্থানে যাবে।
তিনি আরো বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে হতে পারে এবং সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকবে না। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখতে সময় লাগবে।
– খবরওয়ালা/টিএসএন