খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
সরকারের উদ্যোগে সারাদেশে শিশুদের মধ্যে টাইফয়েড প্রতিরোধী টিকা প্রদান শুরু হলেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নানা ধরনের ভিত্তিহীন প্রচারণাও ছড়িয়ে পড়ছে। এই টিকা নিলে মেয়েরা ভবিষ্যতে মা হতে পারবে না, ছেলেশিশুদের পুরুষত্ব হারাবে, এই টিকার পেছনে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চক্রান্ত রয়েছে, এবং বাংলাদেশ দরিদ্র রাষ্ট্র হওয়ায় শিশুদেরকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন সব মিথ্যা তথ্যে অভিভাবক মহল বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।
এই ধরনের গুজব নতুন নয়। কোভিড টিকার সময়েও এমন প্রচারণা দেখা গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তেমন বড় কিছু না ঘটলেও; যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নেতিবাচক প্রচারে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন বন্দুকের মতো যন্ত্র দিয়ে কলেরার টিকা দেওয়া হতো। তখনও গুজব ছিল যে এই টিকা নিলে মেয়েদের আর সন্তান হবে না। এগুলো সবই ভুল বার্তা।’
১২ অক্টোবর টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফরও বলেছিলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরীক্ষিত ও অনুমোদিত এই টিকাটি নিরাপদ ও কার্যকরী। বাংলাদেশে এই টিকা পরীক্ষামূলকভাবে দেওয়া হচ্ছে না। এটি প্রোটিন ও শর্করা উপাদান দিয়ে তৈরি, যা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এতে শরিয়তবিরোধী কোনো উপাদান নেই।’
দেশে ২০২১ সালে ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিল। এদের মধ্যে ৮ হাজার জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৬৮ শতাংশই ছিল শিশু।
টাইফয়েডের এই টিকা সৌদি হালাল সেন্টারের হালাল সনদপ্রাপ্ত জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সকলের প্রতি আহ্বান জানান, কোনো ধরনের গুজব বা অপপ্রচারে কান না দিয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করুন।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), গ্যাভি-দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে শিশুদের টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম দেশ হিসেবে এই ধরনের বৃহৎ অভিযান শুরু করল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত ভারতের বায়োলজিক্যাল ই কোম্পানির তৈরি টিকাটি সরকার গ্যাভি’র মাধ্যমে পেয়েছে। এর আগে পাকিস্তান ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের এই টিকা দেওয়া হয়েছিল।
এই টিকাদান শুরু হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক থেকে শুরু করে শহর ও গ্রামের পারিবারিক আলোচনায় এটি প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। গুজব ছড়ানোর ফলে অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের টিকা দেবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন।
এবারের প্রচারণায় ৪ কোটি ৯০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন চলছে। ১৮ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত ২ কোটির বেশি শিশু নিবন্ধনের আওতায় আসে। এর মধ্যে ১ কোটি ৪ লাখের বেশি শিশু টিকা গ্রহণ করেছে। এই অভিযান আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে।
বগুড়ার ধুনটের মাঠপাড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লতিফা সুকন্যা বলেন, টিকা নেওয়ার জন্য ছাত্রীদের নিবন্ধন করাতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। টিকা নিলে সন্তান হবে না, ক্যান্সার হবে, করোনার টিকা নেওয়ার পর অনেকের নাকি অ্যালার্জি হয়েছিল, তাই এই টিকা নেওয়া যাবে না—এমন অনেক কথা বলছিলেন অভিভাবকেরা। তাই টিকা সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রচার আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
প্রতিরোধ করা সম্ভব এমন মারাত্মক সংক্রামক রোগগুলির মধ্যে টাইফয়েড জ্বর অন্যতম। ‘সালমোনেলা টাইফি’ নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এই রোগ হয়। দূষিত জল, পরিচ্ছন্নতার অভাব ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড ছড়িয়ে পড়ে।
ইপিআই ও আইসিডিডিআরবিতে গত ২৬ বছর টিকা নিয়ে কাজ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাজুল ইসলাম আবদুল বারী। তিনি বলেন, একটি চক্র টাইফয়েড টিকা নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে। এই টিকা হালাল নয়, পুরুষত্ব নষ্ট হবে—এমন অনেক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এই সব গুজবে মনোযোগ দেওয়ার কোনো দরকার নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক যাচাই-বাছাই করেই কোনো টিকার অনুমোদন দেয়। শিশুদের টাইফয়েড রোগ থেকে বাঁচাতে টিকা দেওয়া খুবই অপরিহার্য।
শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, টাইফয়েড টিকা নেওয়ার পর অন্যান্য টিকার মতো সামান্য প্রতিক্রিয়া যেমন, টিকা দেওয়ার স্থান লালচে হয়ে যাওয়া, সামান্য ব্যথা, হালকা জ্বর, ক্লান্তি অনুভব হতে পারে, যা স্বাভাবিকভাবেই সেরে যায়।
অভিভাবকেরা অভিযোগ করছেন, টাইফয়েড টিকা নিয়ে যেভাবে গুজব ছড়াচ্ছে, তা প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগ তেমন দৃশ্যমান নয়।
ইপিআই-এর উপপরিচালক শাহারিয়ার সাজ্জাদ জানান, ‘গণটিকা থেকে সাবধান’—এমন গুজব ছড়ানোর দায়ে একজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি যাতে তার পোস্ট মুছে দেন, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই সব গুজবে কান দেওয়ার কোনো দরকার নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক যাচাই-বাছাই করেই কোনো টিকা কোয়ালিফাই করে। তাজুল ইসলাম আবদুল বারী, চিকিৎসক
তিনি আরও জানান, গুজব প্রতিরোধসহ টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক প্রচারণামূলক কাজ, জাতীয় অ্যাডভোকেসি সভা, জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন আদায়, সংবাদ সম্মেলন, বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠনসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।
টাইফয়েড যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শিশু এবং কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। টাইফয়েডে পরিপাকতন্ত্রে ছিদ্র হওয়া, রক্তপাত, অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, পিত্তথলিতে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোঁড়া এবং স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
টিকা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় টাইফয়েডে আক্রান্তদের ৩০ শতাংশ মারা যেত। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পর মৃত্যুর হার কমেছে। কিন্তু বর্তমানে টাইফয়েডের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকও অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকায় ডায়রিয়াজনিত রোগ ও পুষ্টিবিষয়ক পঞ্চদশ এশীয় সম্মেলনেও টাইফয়েড টিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল। ওষুধ প্রতিরোধী রোগ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গর্ডন ডোগান সম্মেলনে জানান, ঢাকা শহরের টাইফয়েডের জীবাণু ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ঢাকার শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রধান অধ্যাপক সমীর সাহা জানান, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার সমাধান হিসেবে টাইফয়েড টিকার ব্যবহার ফলপ্রসূ হতে পারে। ওই সম্মেলন থেকেই জানানো হয়েছিল, সরকার শীঘ্রই দেশে কলেরা, টাইফয়েড, এইচপিভি ও রোটাভাইরাসের টিকার ব্যবহার শুরু করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন রোগ ও টিকা নিয়ে নীতিপত্র প্রকাশ করে। ২০১৮ সালে টাইফয়েড ভ্যাকসিন বিষয়ক নীতিপত্র প্রকাশ করা হয়। এই বিষয়ে এর আগের নীতিপত্রটি ছিল ২০০৮ সালের। রোগের গুরুত্ব আছে বলেই সংস্থাটি এই নীতিপত্র হালনাগাদ করেছে। এতে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিনের ব্যবহার ও ওষুধ-প্রতিরোধী টাইফয়েডের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
চলতি বছর বিএমসি ইনফেকশাস ডিজিস জার্নালে ১৯৯০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েড জ্বরের প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বাংলাদেশকে টাইফয়েড জ্বরের উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। টাইফয়েডের উচ্চ ঝুঁকির কারণ হিসেবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সীমিত সম্পদ, কার্যকর স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা উপকরণের অভাব, জলবায়ু পরিস্থিতি, মারাত্মক জলদূষণ, এবং জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্বকে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে টাইফয়েড এবং প্যারাটাইফয়েডের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের একদল বিজ্ঞানী ও গবেষক কাজ করছেন। তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ ২০২২ সালের জুলাই মাসে জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়। সেখানেও বাংলাদেশকে টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েডের ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
দেশে হঠাৎ করে টাইফয়েড টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর ‘করোনা ও ডেঙ্গুর কারণে দৃষ্টির আড়ালে টাইফয়েড’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়। টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ৩০ অক্টোবর ‘সাতটি নমুনার তিনটিতে টাইফয়েডের জীবাণু’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, রোগের প্রকোপ না থাকলে সরকার ক্যাম্পেইনের আওতায় এই টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিত না। অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে টাইফয়েডের মৃত্যু কমানো সম্ভব হলেও অ্যান্টিবায়োটিকও অকেজো হয়ে যাচ্ছে। আর অ্যান্টিবায়োটিক-ই বা কতদিন ব্যবহার করা যাবে।
তিনি জানান, টাইফয়েড প্রতিরোধের দুটি প্রধান উপায়ের একটি হচ্ছে রোগটি প্রতিহত করা। এর জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবহার করার পাশাপাশি সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। তবে বস্তিতে থাকা একটি শিশুর পক্ষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়াসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কতটা সম্ভব, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। টাইফয়েড প্রতিরোধের আরেকটি উপায় হলো শিশুকে টিকা দেওয়া। টিকা দিলে শিশুর জীবন বাঁচে, তার উদাহরণ তো ইপিআই কার্যক্রমে বিদ্যমান।
ইপিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৪২ লাখ শিশুকে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রায় ১ লাখ শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া ইপিআই কার্যক্রমে বর্তমানে ১১টি টিকা দেওয়া হয়। টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সাল থেকে ইপিআইতে নিয়মিত টিকা হিসেবে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন যুক্ত করা হবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন