খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ৩:৮ এএম
বিশ্বকাপের মঞ্চে রচিত হলো নতুন এক মহাকাব্য। চরম উত্তেজনা, স্নায়ুচাপ আর মাঠের লড়াইয়ের সবটুকু রোমাঞ্চ ঢেলে দিয়ে শেষ ষোলোর শেষ ম্যাচে কলম্বিয়াকে বিদায় করল সুইজারল্যান্ড। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের দীর্ঘ ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে কোনো দলই ডেডলক ভাঙতে পারেনি। অবশেষে পেনাল্টি শুটআউটের ভাগ্যপরীক্ষায় কলম্বিয়াকে ৪-৩ ব্যবধানে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে সুইসরা। এই জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৭২ বছরের এক আক্ষেপের অবসান ঘটাল ইউরোপের দলটি। ১৯৫৪ সালে নিজেদের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের পর এই প্রথম ফুটবলের মহোৎসবে শেষ আটে জায়গা করে নিল তারা।
বিগত কয়েক বছর ধরে শেষ ষোলোর বৃত্তেই বন্দি ছিল সুইজারল্যান্ড। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২—টানা তিনটি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের প্রথম ধাপ থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। এবার সেই গেরো ভেঙে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সুইসদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আগামী পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনা, যারা আটলান্টায় অনুষ্ঠিত অন্য এক ম্যাচে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে হাজার হাজার আবেগপ্রবণ সমর্থকের উপস্থিতিতে মাঠটি যেন কলম্বিয়ার হোম গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছিল। এই ম্যাচের আগে ডিফেন্সে দারুণ ফর্মে ছিল লাতিন আমেরিকার দলটি, গত চার ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছিল। অন্যদিকে সুইসদের রক্ষণভাগও ছিল টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্ভেদ্য। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের এই রক্ষণাত্মক জমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায়।
ম্যাচের ২১তম মিনিটে প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণটি করে কলম্বিয়া। পেনাল্টি বক্সের প্রান্ত থেকে গুস্তাভো পুয়ের্তার একটি চমৎকার বাঁকানো শট সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল উড়ন্ত সেভ করে জাল অক্ষত রাখেন। প্রথমার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর খেলার গতি বাড়ায় সুইজারল্যান্ড। তবে কলম্বিয়ার গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান; প্রথমে ফ্যাবিয়ান রিডারের একটি জোরালো শট এবং পরবর্তীতে ড্যান এনডোয়ের আক্রমণ দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন তিনি। ফলে গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সুইজারল্যান্ড আরও আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। তবে কলম্বিয়াও পাল্টা আক্রমণ চালাতে ভুল করেনি। দলটির ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজ গোল করার একটি ভালো সুযোগ পেলেও তার শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচের সময় যত গড়াচ্ছিল, দুই দলের কোচের কৌশলী পরিবর্তনও তত বাড়ছিল। তবে পরিষ্কার কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না কেউই। বিশেষ করে কলম্বিয়ার প্রধান তারকা উইঙ্গার লুইস দিয়াজকে পুরোটা সময় কড়া পাহারায় বোতলবন্দি করে রাখে সুইস ডিফেন্ডাররা। নির্ধারিত সময়ের ঠিক শেষ মুহূর্তে ড্যান এনডোয়ের একটি দুর্দান্ত শট গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে গেলে ম্যাচটি ০-০ সমতায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে মাঠের উত্তেজনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নবম মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার জন লুকুমির একটি চমৎকার হেড গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে দুর্ভাগ্যবশত গোলবঞ্চিত হয় কলম্বিয়া। এরপর জামিন্টন ক্যাম্পাজের একটি জোরালো শট কোবেল আবারও নস্যাৎ করে দেন। পরক্ষণেই কলম্বিয়ার গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সুইস বদলি খেলোয়াড় জেকি আমদুনির একটি নিশ্চিত গোল করা শট আটকে দেন। খেলার শেষ পাঁচ মিনিটে ক্যাম্পাজ ম্যাচ জেতানোর আরও একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে পেনাল্টি শুটআউট নিশ্চিত হয়ে যায়।
টাইব্রেকারের চরম নাটকীয়তায় দুই দলই পেনাল্টি মিসের মহড়ায় নামে। সুইজারল্যান্ডের ম্যানুয়েল আকাঞ্জি শট গোলবারের ওপর দিয়ে মারলে সুইস শিবিরে শঙ্কা জাগে। তবে কলম্বিয়ার ডেভিনসন সানচেজ প্রথমে গোল মিস করেন। এরপর কলম্বিয়ার কুচো হার্নান্দেজের নেওয়া শেষ শটটি সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দিয়ে দলের নায়কে পরিণত হন। শেষ শটে রুবেন ভার্গাস ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো সুইজারল্যান্ড দল। ৭২ বছর পর ইতিহাস গড়ে মাঠ ছাড়ে সুইসরা, আর অশ্রুসিক্ত চোখে বিশ্বকাপকে বিদায় জানায় কলম্বিয়া।
মন্তব্য