খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১০:২৮ এএম
টানা ভারী বর্ষণের ফলে কক্সবাজারে পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং একজন কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা। রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। পাহাড়ধসের ঘটনায় কয়েকজন আহতও হয়েছেন। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে প্রবল বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ের মাটি ধসে একটি বসতঘরের ওপর এসে পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস মাটিচাপা পড়েন। খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। পরে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই ঘটনায় আরও দুজন আহত হন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। তবে ঘরটি সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ায় ভেতরে আটকে পড়া তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এর কিছুক্ষণ পর উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। রাত পৌনে ২টার দিকে পাহাড় থেকে ধসে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে সাত বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশু একরামের মৃত্যু হয়। সে ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের ছেলে। স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন বলে ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানিয়েছেন।
রাত ৩টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরও একটি ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে একই সঙ্গে চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রশিদের ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং তার ছোট ভাই হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন বলে ক্যাম্প প্রশাসন জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পাহাড়ি ঢালে গড়ে ওঠায় বর্ষা মৌসুমে সেখানে পাহাড়ধসের ঝুঁকি প্রতি বছরই বেড়ে যায়। টানা বৃষ্টির সময় নরম হয়ে যাওয়া মাটি ধসে পড়লে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালের নিচে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবীরা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে থাকে।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকাতেও ভোর ৪টার দিকে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ধসে একই পরিবারের তিনজন চাপা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাদের বের করে আনেন। গুরুতর আহত আলী আকবরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য দুইজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
উখিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে নিয়মিত মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও রয়েছে। তাই প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে সবাইকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ ভারী বর্ষণ হচ্ছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী আরও অন্তত দুই দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং নিচু এলাকায় আকস্মিক পানি বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য