খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ এএম
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দ্বিপাক্ষিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র তোয়াক্কা না করে টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) আজ শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোরে এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত সেন্টকমের বার্তায় বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তথা সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আদেশে ইরানে এই ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে গুড়িয়ে দিতেই মার্কিন বাহিনীর এই আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও সেন্টকম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইরনা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশলগত প্রদেশ হরমুজগান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজগানের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক ডেপুটি গভর্নর জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে প্রদেশের বেশ কয়েকটি সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভারী বোমাবর্ষণ করে। এই হামলায় এখন পর্যন্ত ৩ জন বেসামরিক নাগরিক/সেনা নিহত এবং অন্তত ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এরই মধ্যে এডেন উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের অভিজাত সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালির ইরানি জলমাইন অঞ্চলে প্রবেশ করায় দুটি বিদেশি বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজ বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্টকম আইআরজিসির এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মার্কিন সামরিক আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করার জোর দাবি জানিয়েছে তেহরান। অন্যথায় এই সংঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন ইরানি নীতিনির্ধারকরা।
শুক্রবার রাতের ধ্বংসযজ্ঞের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
“যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক আইন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এভাবে প্রতি রাতে হামলা চালাতে থাকে, তবে ইরান আর চুপ করে বসে থাকবে না। আমরা শুধু রক্ষণাত্মক পাল্টা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার পূর্ণমাত্রার সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হব। আর ইরান যদি একবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই আর নিরাপদ বা সুরক্ষিত থাকবে না।”
চলতি বছরের ৫ জুলাই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের দাবি, এই হামলা দু’দেশের মধ্যকার শান্তি বজায় রাখার ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র চরম লঙ্ঘন। এই ঘটনার পর থেকেই তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছায়।
এর ঠিক দুই দিন পর, ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “ইরানের সাথে আমাদের যুদ্ধবিরতির চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা শান্তি চায় না, যা ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইরানের বর্তমান শাসকরা অসুস্থ মানসিকতার। আমি মনে করি, তাদের সাথে নতুন কোনো শান্তিচুক্তির আলোচনা করা মানে স্রেফ সময় নষ্ট করা।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী ঘোষণার পরই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে অভিযানের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে, গত ১১ জুলাই রাত থেকে শুরু হওয়া মার্কিন সেন্টকমের এই বিধ্বংসী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা গতকাল শুক্রবার রাতে টানা সপ্তম দিনের মতো সফলভাবে সম্পন্ন হলো। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য