খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইউরোপজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব হিসেবে শুরু হয়েছে রেকর্ডভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহ। এই চরম আবহাওয়ার কারণে মহাদেশটির বিভিন্ন দেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক এই দাবদাহের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে বেলজিয়ামে। চলতি গ্রীষ্মকালের জুনের শেষভাগ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত—মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দেশটিতে প্রায় ২,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র গরম এবং এর ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাই এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির প্রধান কারণ বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
বেলজিয়ামের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিয়েনসানো (Sciensano) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৮ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত সময়সীমার মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় বেলজিয়ামের সব অঞ্চলে মৃত্যুর হার সমান ছিল না। সিয়েনসানোর দেওয়া তথ্যমতে:
ওয়ালোনিয়া: বেলজিয়ামের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই প্রদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
ব্রাসেলস: প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশটির রাজধানী ব্রাসেলস।
ফ্ল্যান্ডার্স: দেশের উত্তরাঞ্চলীয় এই প্রদেশটি মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
সিয়েনসানোর বক্তব্য: “চলতি বছরের এই পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।”
সিয়েনসানো জানিয়েছে, তারা ২০০০ সাল থেকে দেশে তাপপ্রবাহ জনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করছে। গত ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেলজিয়ামে এর আগে কখনো তাপপ্রবাহের কারণে এত অল্প সময়ে এত বেশি মানুষের মৃত্যু হয়নি।
তীব্র হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা) এবং অতিরিক্ত গরমের কারণে মানবদেহের দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলোর (যেমন হৃদরোগ, কিডনি ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা) প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এই রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুর মূল কারণ। এর আগে বেলজিয়ামে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহের কারণে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০২০ সালে। করোনাকালের সেই ভয়াবহ বছরে দেশটিতে তাপপ্রবাহে ১,৫৫৭ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে চলতি বছরের বর্তমান পরিসংখ্যান পূর্বের সেই সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ডকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণেই ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা প্রতি বছর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতে সাধারণত মৃদু গ্রীষ্মকাল দেখা গেলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানকার তাপমাত্রা ক্রমাগত চরম রূপ ধারণ করছে।
চিকিৎসকেরা এই পরিস্থিতিতে প্রবীণ নাগরিক, শিশু এবং পূর্ব থেকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে ঘরের বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং শরীর ঠান্ডা রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় বেলজিয়াম সরকারকে তাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জরুরি সাড়াদান সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবাদীরা।