খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৫৫ এএম
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা চাচ্ছেন, শুধু তারাই ‘প্রকৌশলী’ উপাধি ব্যবহার করবেন। একইসঙ্গে তারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য সংরক্ষিত ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ পদেও নিয়োগ পেতে চান। অন্যদিকে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা যারা তাদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে মানতে রাজি নন, তাদেরই নিম্ন পদে চাকরির আগ্রহকে ‘দ্বৈত নীতি’ বলে উল্লেখ করে নিজেদের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমেছেন।
তাদের এই আন্দোলন নিয়ে গতকাল বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পেশাজীবী প্রকৌশলীদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. কবীর হোসেন বলেন, ‘সমস্যাগুলো নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। সব পক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার পর ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কমিটি সমস্যা সমাধানে একটি রূপরেখা দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাকে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বলা হবে বা হবে না, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে।’
কবীর হোসেন জানান, ‘দশম গ্রেডের প্রবেশ পদে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করতে পারবেন না, এই নিয়ম বর্তমানে যেমন আছে তেমনই থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট এবং মেট্রোরেলে যে নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা নবম গ্রেডে পদোন্নতি পাবেন, তবে আপাতত ৩৩ শতাংশই বহাল থাকছে।’
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের আহ্বায়ক মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘তারা গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। সাধারণত মানুষ উচ্চ পদে যেতে চায়, কিন্তু তারা নিম্ন পদে আবেদনের সুযোগ চাইছে। অথচ তারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বলতে রাজি নয়। এটা তাদের দ্বৈত মানসিকতা। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা মাঠে থেকে কাজ বাস্তবায়ন করেন। গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলীরা পরিকল্পনা ও নকশা করবেন এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা তা বাস্তবায়ন করবেন। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস না করলে ‘উপ-সহকারী’ পদে আবেদন করার সুযোগ নেই, তবুও তারা (বিএসসি প্রকৌশলীরা) গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিয়ে সেই পদে চাকরি করতে চান। তারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ‘টেকনিশিয়ান’ বলেন, তাহলে সেই পদে তারা কেন চাকরি চাইবেন? তাদের তিনটি দাবিই পরস্পরবিরোধী।’
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ৬টি দাবি: ১. হাইকোর্ট কর্তৃক জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের অবৈধ পদোন্নতির রায় বাতিল করতে হবে। ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের পদবি পরিবর্তন এবং মামলার সঙ্গে জড়িতদের চাকরিচ্যুত করতে হবে। ২০১৪ সালে ‘রাতের অন্ধকারে’ নিয়োগ পাওয়া ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের নিয়োগ বাতিল করতে হবে এবং সেই বিতর্কিত নিয়োগবিধি অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে। ২. ডিপ্লোমা ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে যেকোনো বয়সে ভর্তির সুযোগ বাতিল করতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো চার বছর মেয়াদি একটি মানসম্মত পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে এবং শিক্ষাকার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ইংরেজি মাধ্যমে করা হবে। ৩. যেসব সরকারি, রাষ্ট্রীয়, স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নিম্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যদিও উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং সমমান (দশম গ্রেড) পদটি তাদের জন্য সংরক্ষিত। ৪. কারিগরি খাত পরিচালনায় পরিচালক, সহকারী পরিচালক, বোর্ড চেয়ারম্যান, উপসচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অধ্যক্ষসহ সব পদে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এমন জনবল নিয়োগ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইনগতভাবে তা নিশ্চিত করতে হবে। এই পদগুলোতে অবিলম্বে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং সব শূন্য পদে দক্ষ শিক্ষক ও ল্যাব সহকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। ৫. একটি স্বতন্ত্র ‘কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা’ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং একটি ‘কারিগরি শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করতে হবে। ৬. পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের জন্য একটি উন্নতমানের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে, নির্মাণাধীন চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (নড়াইল, নাটোর, খাগড়াছড়ি ও ঠাকুরগাঁও) পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করে ডুয়েটের অধীনে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শতভাগ আসনে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন দাবি: বুধবার ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে সড়ক অবরোধ করেন। আন্দোলন থেকে তারা আগের ৬টি দাবির সঙ্গে আরও ৪টি নতুন দাবি উত্থাপন করেন। সেগুলো হলো: ১. ‘প্রকৌশল অধিকার আন্দোলন’ কর্তৃক ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রকাশ্যে গুলি ও জবাই করে হত্যার হুমকি দেওয়া ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের অযৌক্তিক তিন দফা দাবির পক্ষে পরিচালিত সব ধরনের সরকারি কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ৩. ‘কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ’ কর্তৃক উত্থাপিত যৌক্তিক ছয় দফা দাবির রূপরেখা ও সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ৪. ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ান-চ্যানেল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বিএসসি প্রকৌশলীদের তিনটি দাবি: ১. নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদে শুধুমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ এবং ন্যূনতম যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার করা। ২. দশম গ্রেডে যেখানে শুধুমাত্র ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারেন, সেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারীদেরও আবেদন করার সুযোগ করে দেওয়া। ৩. শুধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারীরাই যেন ‘প্রকৌশলী’ (ইঞ্জিনিয়ার) পদবি ব্যবহার করতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।
খবরওয়ালা/টিএসএন
মন্তব্য