খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে কার্তিক ১৪৩২ | ২৮ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথে বর্তমানে সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু হলো জুলাই জাতীয় সনদ। ২০২৪ সালের লাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত এই সনদ যেন নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একে বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উত্তরণের দলিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধান এখন স্পষ্ট।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) নিজের ইউটিউব চ্যানেলে এক বক্তব্যে এসব মন্তব্য করেন জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন—সংবিধান সংস্কার কবে হবে এবং কীভাবে হবে। কমিশনের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদই সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা পালন করবে। ৯ মাসের মধ্যে সংস্কার কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
তবে এই সময়সীমার মধ্যে সংসদ ব্যর্থ হলে এর পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে গণভোটে সাংবিধানিক আদেশ অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা অনিশ্চিত।
তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা চান কমিশনের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হোক। কিন্তু এই বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনও অনির্ধারিত।
তিনটি আলোচিত বিকল্প সামনে এসেছে—
১. ৯ মাসের মধ্যে ব্যর্থ হলে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচন, যা নতুন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
২. নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয় সংবিধান সংশোধন, যা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সনদ কোনো সাধারণ বিল নয়; পরিষদের বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।
৩. নির্বাচনের আগে পরিষদ, পরে সংসদ—যা রাজনৈতিকভাবে অনির্দিষ্ট।
তাই বাস্তবে কমিশন সম্ভবত নির্দেশনামূলক পথ নেবে, অর্থাৎ সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলো ক্ষমতায় এলে তা বাস্তবায়ন করবে—এটাই জুলাই সনদের কার্যকর ভিত্তি।
জিল্লুর রহমান বলেন, মূল উদ্বেগের বিষয় হলো জনআস্থা।
যে সনদ প্রায় এক হাজার শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছে, তার বাস্তবায়ন কি কেবল ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে? নাকি নাগরিকদের হাতে একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো তুলে দেওয়া উচিত ছিল? গণভোট যদি শুধু মতামতের প্রতীক হয়, বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া, তবে এটি রাজনৈতিক প্রদর্শনীর পর্যায়ে নেমে আসে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের আরেকটি জটিলতা বিএনপি ও সমমনা দলের নোট অফ ডিসেন্ট। উচ্চকক্ষ গঠনসহ নয়টি মৌলিক সংস্কারে তাদের আপত্তি রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—গণভোটে জনগণ সম্পূর্ণ সনদ অনুমোদন করবে, নাকি বিবাদমান অংশ বাদ দেবে? আপসের রাজনীতির এই সময়ে নোট অফ ডিসেন্টের টানাপোড়েন পুরো প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে দিতে পারে।
জিল্লুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, জুলাই সনদ কি আসলেই জুলাই রক্তঝরা আন্দোলনের দাবি পূরণ করেছে? লাল জুলাইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য দূর করা। কিন্তু ৮৪টি সুপারিশের মধ্যে কৃষি, ভূমি, বাজার, শ্রমিক অধিকার, নারী অংশগ্রহণ, তরুণদের চাকরি ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাব অনুপস্থিত। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জলবায়ু সংকটের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোও উপেক্ষিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের ‘থ্রি জিরো’ নীতির প্রতিফলনও এই ঐতিহাসিক দলিলে নেই। নারী অংশগ্রহণের ঘাটতি ও কমিশনের গঠিত ১১টি কমিটির মধ্যে মাত্র পাঁচটির সুপারিশ রাজনৈতিক দলের কাছে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংস্কার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও বাস্তবায়ন হয়নি, যদিও ২০২৪ সালের সহিংসতার পেছনে এ বাহিনীর ভূমিকা কেন্দ্রীয় ছিল।
তার মতে, অবিলম্বে অন্তত ৪০টি সুপারিশ প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। জুলাই সনদের আসল শক্তি কর্মে, কথায় নয়।
জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতের ক্ষমা প্রার্থনা ইতিবাচক রাজনৈতিক আচরণ নয়, যদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস উপেক্ষা করা হয়। গণতন্ত্রে শুধু ক্ষমা চাইলেই ইতিহাস শুদ্ধ হয় না; পরিবর্তন আসে কাজ ও নীতির ধারাবাহিকতায়।
শেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও তরুণ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু নিরাপত্তা—এই চারটি স্তম্ভ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ভিত্তি হবে। ইতিহাস আমাদের হাতে আগুন তুলে দিয়েছে; এখন প্রশ্ন, আমরা কি সেই আগুন দিয়ে আলোকিত পথ তৈরি করব, নাকি আবারও নিজেদের হাত পুড়িয়ে ফেলব। এই মুহূর্তের নাম—দায়বদ্ধতা।
খবরওয়ালা/টিএসএন