খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশু রোগীর মাকে ধর্ষণের নির্মম ঘটনার প্রেক্ষিতে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নাটোরের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার (১০ জুন) দুপুরে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে কমিটির সদস্যদের নাম এখনই প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান যে, গঠিত এই তদন্ত কমিটিতে প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের বাইরে থেকে দুইজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে একজনকে সদস্য হিসেবে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার বাহ্যিক প্রভাব যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
ঘটনার বিবরণ ও মামলা দায়ের:
হাসপাতাল ও মামলার এজাহার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত রোববার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে দুই বছর বয়সী এক অসুস্থ কন্যাশিশুকে ভর্তি করা হয়। শিশুটির মা চিকিৎসার প্রয়োজনে সেখানে অবস্থান করছিলেন। সে সময় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী অমিত (২৩) ওষুধ দেওয়ার কথা বলে কৌশলে ওই ভুক্তভোগী নারীকে হাসপাতালের লিফটে করে ছয়তলার নির্জন সিঁড়িঘরে নিয়ে যায়। সেখানে লিফট থেকে নামিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়।
ধর্ষণের মূল ঘটনার সময় সেখানে অমিতের আরও দুই সহযোগী পরিচ্ছন্নতাকর্মী অনিল ও প্রাঙ্গণ উপস্থিত ছিল। তারা সম্পূর্ণ ঘটনার ভিডিওচিত্র মুঠোফোনে ধারণ করে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে সেখানে অবরুদ্ধ করে রেখে সেই ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে পুনরায় ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়।
দীর্ঘ সময় মায়ের অনুপস্থিতির কারণে দুই বছর বয়সী শিশুটি ওয়ার্ডে কান্নাকাটি শুরু করলে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের নজরে আসে। রাত আনুমানিক ২টার দিকে আনসার সদস্যরা হাসপাতালের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফুটেজে সন্দেহভাজন গতিবিধি শনাক্ত করার পর তারা ছয়তলার সিঁড়িঘরে অভিযান পরিচালনা করেন এবং অভিযুক্তদের হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন। তবে ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীর পরিবার।
পরবর্তীতে এই অপরাধের প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী নারীর বাবা বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে শহরের আলাইপুর এলাকার সুইপার কলোনি থেকে অভিযুক্ত তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।
অভিযুক্তদের বিবরণ ও আইনি পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থা:
নাটোর সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে মামলার আসামিদের সনাক্তকরণ এবং আইনগত পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। নিচে টেবিলের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক নং | আসামির নাম | বয়স | ঠিকানা ও পেশা | অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও বর্তমান অবস্থা |
| ১ | অমিত | ২৩ বছর |
বাসিন্দা: আলাইপুর সুইপার কলোনি, নাটোর। পেশা: পরিচ্ছন্নতাকর্মী। |
মূল অভিযুক্ত (ধর্ষণকারী)। বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে গ্রেফতার রয়েছে। |
| ২ | অনিল | ২৪ বছর |
বাসিন্দা: আলাইপুর সুইপার কলোনি, নাটোর। পেশা: পরিচ্ছন্নতাকর্মী। |
সহযোগী; অপরাধের ভিডিও ধারণ এবং পুনরায় ধর্ষণচেষ্টা। বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছে। |
| ৩ | প্রাঙ্গণ | ২৩ বছর |
বাসিন্দা: আলাইপুর সুইপার কলোনি, নাটোর। পেশা: পরিচ্ছন্নতাকর্মী। |
সহযোগী; অপরাধের ভিডিও ধারণ এবং পুনরায় ধর্ষণচেষ্টা। বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছে। |
পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া:
নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনসুর রহমান মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে জানান যে, ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী নারীর আইনি জবানবন্দি বিজ্ঞ আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালেই তার প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা (ফরেনসিক পরীক্ষা) সম্পন্ন হয়েছে। অপরাধের সত্যতা প্রমাণের স্বার্থে এবং মামলার বস্তুগত সাক্ষ্য হিসেবে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং ডিজিটাল আলামত আইনগতভাবে জব্দ করেছে পুলিশ।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা তাদের সহায়তাকারীদের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় যাই হোক না কেন, কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর।
এদিকে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ঘটনার রাতে আনসার সদস্যরা আসামিদের হাতেনাতে ধরে এনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করলেও কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদের ছেড়ে দেয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, শুরুতে হাসপাতাল প্রশাসন বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এই কারণে বর্তমানে ভুক্তভোগী নারী এবং তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। স্থানীয় নাগরিক সমাজ হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।