খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও থিয়েটার কর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই সন্দেহভাজন আসামি, অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান এবং সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (৮ জুন) কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হক এই আদেশ প্রদান করেন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম বর্তমানে কুয়েতে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান কোন দেশে আত্মগোপন করে আছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত একমাত্র গ্রেপ্তার হওয়া আসামি কুমিল্লা সেনানিবাসের স্ট্যাটিক সিগন্যালের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
আদালত ও মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হোগড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং কুমিল্লা সেনানিবাসের স্ট্যাটিক সিগন্যালের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করার পর নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে হাফিজুর রহমান তনু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার বিবরণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং হাফিজুরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ও সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং এই অপরাধের সাথে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।
বিজ্ঞ বিচারক মুমিনুল হক মামলার এই নতুন মোড় এবং আসামিদের বিদেশে পালিয়ে থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। তিনি দেশের বাইরে পলাতক এই দুই প্রধান সন্দেহভাজনকে দ্রুত দেশের আইনের আওতায় আনতে এবং আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। একই সাথে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রেড নোটিশ জারি করতে প্রয়োজনীয় সকল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলামকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এর আগে, বিগত ২২ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারকৃত আসামি হাফিজুর রহমানকে মো. মুমিনুল হকের আদালতে হাজির করেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আসামির সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন। বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ওই সাবেক সেনাসদস্যের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, রিমান্ডের অনুমোদিত সময়ে হাফিজুর রহমানকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরে অবস্থিত বিশেষ ইউনিটের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, গত ২৫ এপ্রিল তাকে পুনরায় কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাকে জামিন না দিয়ে সরাসরি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সোমবার মামলার নির্ধারিত ধার্য তারিখে কারাবন্দি হাফিজুর রহমানকে পুনরায় আদালতে হাজির করা হয়েছিল। আদালত মামলার সার্বিক নথি পর্যালোচনা করে তাকে আবার কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সোমবার মামলার পূর্বনির্ধারিত তারিখ ধার্য থাকার কারণে কারাবন্দি অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের নির্দেশনানুযায়ী শুনানির পর তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যা মামলার নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রমেরই একটি অংশ। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘটনার সাথে জড়িত ও সন্দেহভাজন অপর আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করাসহ তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য পিবিআইয়ের বিশেষ দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে অলিপুর এলাকায় একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে গভীর রাতে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি ঝোপের মধ্যে তনুর রক্তাক্ত ও অচেতন দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিচার নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আসামিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির এই নির্দেশনা মামলাটিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করল।