দীর্ঘ এক দশক ধরে আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা এই মামলাটি নতুন করে গতি পায় সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তারের পর। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় নাগরিক সমাজও বিচারের বিষয়ে নতুন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে পিবিআই হাফিজুর রহমানকে আটক করে। পরবর্তীতে তাঁকে তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। আদালত শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী হাফিজুর রহমান ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। সন্দেহভাজনদের মধ্যে হাফিজুর রহমান ছাড়াও সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলম (বা জাহিদ—নাম নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে) অন্তর্ভুক্ত। ইতিমধ্যে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ
| সাল/তারিখ |
ঘটনা |
| ২০ মার্চ ২০১৬ |
কুমিল্লা সেনানিবাসে তনুর মরদেহ উদ্ধার |
| ২১ মার্চ ২০১৬ |
অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের |
| এপ্রিল ও জুন ২০১৬ |
দুই দফা ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ব্যর্থতা |
| মে ২০১৭ |
ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশ |
| অক্টোবর ২০১৭ |
সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ |
| ৬ এপ্রিল ২০২৬ |
তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন ও ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন |
| ২১ এপ্রিল ২০২৬ |
হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার |
| ২৩ এপ্রিল ২০২৬ |
আদালতে হাজির ও রিমান্ড মঞ্জুর |
তনুর মরদেহ ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি ঝোপঝাড় এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরদিন তাঁর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। তবে পরিবার দাবি করে আসছে, শুরু থেকেই তাঁরা নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ডিএনএ পরীক্ষা। ২০১৭ সালে তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনায় তিনজন পুরুষের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। তবে এতদিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় মামলাটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং অন্যান্য সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে তনুর পরিবার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী দোষীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, তদন্তে আর কোনো বাধা সৃষ্টি না হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।