খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ভাদ্র ১৪৩২ | ৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারবহির্ভূত হামলা ও মারধরের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। এসব ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক সময় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আক্রান্ত ব্যক্তিকেই আটক করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
মব সন্ত্রাসের ধরন ও কারণ
দেশে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাসে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি আইনকে উপেক্ষা করে প্রশাসন বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর হামলা করছেন এবং জোর করে পদত্যাগপত্র আদায় করছেন। ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মারধর বা হেনস্তা করা যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মূলত ৫ আগস্টের পর থেকে এ ধরনের মব সন্ত্রাস শুরু হয়েছে, যা প্রথমে জেলা পর্যায়ে দেখা গেলেও ধীরে ধীরে রাজধানীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আদালতে নেওয়ার সময়ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেকে জুলাই আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছেন।
আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩১ ও ৩৫(৩) অনুসারে, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকার অধিকার রয়েছে এবং কোনোভাবেই আইনবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার শুধুমাত্র স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে হতে পারে।
আলোচিত কিছু ঘটনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেড় শতাধিক ব্যক্তি মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা হলো:
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর: ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কর্তৃক দুজনকে পিটিয়ে হত্যা।
২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে জুতার মালা পরিয়ে মারধর।
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল: অভিনেতা সিদ্দিককে মারধর এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের।
২২ জুন: সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদাকে মারধর ও জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া।
এছাড়াও পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, ডা. দীপু মনি, সালমান এফ রহমানসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি হামলার শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা
চলতি বছরের আগস্টে দুটি ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৫ আগস্ট রিকশাচালক আজিজুর রহমানকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মারধর করা হয় এবং পরে তার নামে হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়, যা পরে বাতিল হয়। ২৯ আগস্ট ‘মঞ্চ-৭১’ নামের একটি সংগঠনের গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তাদেরসহ ১৬ জনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়।
অতীতকে টেনে আনার প্রবণতা
অনেকে বিচারবহির্ভূত ঘটনার পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন এবং অতীত সরকারের সময়ের ঘটনার উদাহরণ টেনে বর্তমানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী)-এর নির্বাহী ফোরামের সদস্য সীমা দত্ত বলেন, ‘অন্যায় সবসময়ই অন্যায়, এক অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে আরেকটিকে জায়েজ করা যায় না।’ তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকর ভূমিকা দেখতে চান।
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিচার না পাওয়ার কারণে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বাড়ছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘আমরা তো আইন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই লড়াই করেছি। তাই এসব আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব।’ এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার তাগিদ দেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন