নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প বর্তমানে এক গভীর অচলাবস্থার মুখোমুখি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা সংকট ও নিরাপত্তার অভাবে পর্যটনের প্রাণকেন্দ্রগুলোতে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। পাহাড় থেকে সমুদ্র, শহরতলি থেকে গ্রামীণ বিনোদন স্পট—সবখানেই পর্যটকের উপস্থিতি কার্যত শূন্য।
পাহাড়ে পর্যটন কার্যত বন্ধ
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মত জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন এলাকাগুলো প্রায় পর্যটকশূন্য। কয়েকটি এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পর্যটকরা এখন এসব স্থানে যেতে ভয় পাচ্ছেন। রাঙামাটি পর্যটন মোটেলের বুকিং হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ঝুলন্ত সেতুর মতো প্রধান আকর্ষণও এখন পর্যটকশূন্য। পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা—হোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌচলাচল, বাজার—সবই কার্যত স্থবির।
সমুদ্রতটে নেই পর্যটকের ভিড়
দেশের প্রধান দুই সমুদ্রতট কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পর্যটক সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কক্সবাজারের প্রায় ৫০০ হোটেল-মোটেল বর্তমানে খালি পড়ে আছে। রেস্টুরেন্টগুলোও একই দুরবস্থায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ বা সরকারি ছুটির সময় কিছুটা পর্যটক এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।
কুয়াকাটার হোটেল ব্যবসায়ী সুমন দেব জানান, আগের মতো পর্যটকের ভিড় আর দেখা যায় না। নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া সৈকত এলাকায় পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে।
শহরতলির রিসোর্টগুলোতেও অচলাবস্থা
ঢাকার আশেপাশের গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ—এসব অঞ্চলের রিসোর্টগুলোতেও চলছে সংকট। আগে যেখানে করপোরেট ও পারিবারিক বুকিং পেতে হিমশিম খেতে হতো, এখন সুনসান নীরবতা।
গাজীপুরের ‘ছুটি রিসোর্ট’-এর হেড অব সেলস মাজহারুল ইসলাম বলেন, “৫ আগস্টের আগে আমরা প্রতিনিয়ত বুকিং সামলাতে ব্যস্ত থাকতাম। এখন ব্যবসা বলতে গেলে ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধুমাত্র করপোরেট মিটিং দিয়েই কোনোভাবে টিকে আছি।”
মুন্সিগঞ্জের এক রিসোর্ট মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ ঘুরতে আসবে না। আমরা হয়তো শিগগিরই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হব।”
সিলেটেও একই চিত্র
সিলেট অঞ্চলের জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুলের মতো জনপ্রিয় এলাকাগুলো পর্যটকশূন্য। স্থানীয় রিসোর্ট, গেস্ট হাউস, রেস্টুরেন্ট ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা চরম মন্দার মধ্যে। পর্যটনকেন্দ্রিক কুটির ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রণোদনা ছাড়া এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতেও ধস
বাংলাদেশ হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন বলেন, “আগে রাতভর হোটেল-রেস্তোরাঁ খোলা থাকত। এখন রাত ১১টার পর বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে যায়। এমন চলতে থাকলে এই খাত ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে।”
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সীমাবদ্ধতা
ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, তারা ১৩০টি পর্যটন স্পটে নিয়মিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। জনবল ও সরঞ্জাম সীমিত হলেও নতুন ড্রোন, পাহাড়ি যানবাহন, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তি সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করছে, জনবল বাড়ানো ছাড়া এই চাপ সামলানো সম্ভব নয়।
পর্যটন খাত শুধু বিনোদন নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। লাখ লাখ মানুষের জীবিকা, অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এই সম্ভাবনাময় খাত টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে পর্যটন শিল্পের এই মন্দা দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
খবরওয়ালা/এমএজেড