খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
ইংরেজি শব্দ ‘রেফারেন্ডাম’–এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণভোট’। সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগকে ঘিরে দেশজুড়ে এখন আলোচনায় রয়েছে এই শব্দটি। গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করে। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম গণতান্ত্রিক উপায়।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামত যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গণভোটের ভূমিকা বিশেষভাবে স্বীকৃত। সংবিধান সংশোধন, নতুন আইন প্রণয়ন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন কিংবা শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণত গণভোট আয়োজন করা হয়। ভোটাররা সাধারণত ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্ন দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান।
স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল প্রশাসনিক গণভোট এবং একটি সাংবিধানিক। প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে। দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়ে। সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, যা ছিল সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের সাংবিধানিক গণভোট।
যে কারণে গণভোট হয়েছিল
১. প্রথম গণভোট হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনের বৈধতা যাচাই।
ওই বছরের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকের খবর থেকে জানা যায়, সারা দেশে ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ৩০ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হয়। ওই সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ।
সেই গণভোটে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।
২. দ্বিতীয় গণভোট হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। উদ্দেশ্য ছিল এরশাদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে জনসমর্থন যাচাই। জনগণের আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সেই গণভোটে ৭২ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার উপস্থিত ছিল। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
৩. গণ-আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ। এর ৩ মাসের মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় পদ্ধতির (পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি) সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে বিল পাস হয়।
ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে গৃহীত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সম্মতি দেবেন কি না, সে প্রশ্নে দেশব্যাপী গণভোট আয়োজনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত সেই তৃতীয় গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। গণভোটে ৯৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৈধ ভোটের বিপরীতে বাতিল হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোটা।
খবরওয়ালা/এমএজেড