ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে ডানপন্থী কয়েকটি সংগঠনের হুমকির অভিযোগের পর গরবা অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সংগীত পরিবেশনা বাতিল করেছেন শিল্পী জাভেদ খান। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠানের সূচি থাকলেও শেষ পর্যন্ত মঞ্চে ওঠা হয়নি তাঁর। আয়োজকদের দাবি, একজন মুসলিম শিল্পীর অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তাঁদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকেই শেষ পর্যন্ত পরিবেশনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রামে প্রায় সাত লাখ অনুসারী থাকা জাভেদ খানের অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনা জয়পুরে সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো শিল্পীর পরিবেশনায় বাধা দেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জাভেদ খান জানিয়েছেন, জয়পুরেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শহরটির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এমন একটি শহরে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবেশনা বাতিলের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন এই শিল্পী।
তিনি জানান, অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে কোনো ব্যবসায়ী বা আয়োজক যেন আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে কথা বিবেচনা করেই তিনি অগ্রিম নেওয়া অর্থ ফেরত দিয়েছেন। অনুষ্ঠান বাতিলের কারণে আয়োজকদের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা কমানোর চেষ্টা করেছেন বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
একই সঙ্গে, প্রকাশ্যে আয়োজকদের হুমকি দেওয়ার পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন জাভেদ। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে এমন উদ্বেগ তৈরি হলে শিল্পী ও আয়োজক—উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়েন।
ব্যানার-হোর্ডিং নিয়েও অভিযোগ
জাভেদ খানের অভিযোগ, জয়পুরের বিভিন্ন স্থানে ডানপন্থী সংগঠনগুলোর ব্যানার ও হোর্ডিংয়ে গরবা অনুষ্ঠানে অমুসলিমদের প্রবেশ সীমিত করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যে শহরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন, সেখানে এ ধরনের প্রচার সামাজিক সম্প্রীতির জন্য উদ্বেগজনক।
গরবা ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, যা ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি অনেক জায়গায় সামাজিক মিলনমেলার রূপ নিয়েছে। এমন আয়োজনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা শুধু শিল্পীর পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলে না, বরং উৎসবের পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
হুমকির অভিযোগে পিছু হটলেন আয়োজকেরা
ময়লসে ক্লাবের আয়োজক রবি প্যাটেল জানিয়েছেন, জাভেদ খানের পরিবেশনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠান ঘিরে টিকিটও বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু সনাতন সুরক্ষা দল ও বজরং দলের সদস্যদের কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পর তাঁরা অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করেন তিনি।
প্যাটেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনে হুমকি পাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। নিজেদের এবং অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পরও তাঁদের আয়োজন বাতিল করতে হয়।
এতে আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন প্যাটেল। তবে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। টিকিট বিক্রি ও আয়োজনের প্রস্তুতিতে অর্থ ব্যয়ের পর অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
অমুসলিমদের অংশগ্রহণে আপত্তি
অন্যদিকে, সনাতন সুরক্ষা দলের সদস্য রবি গৌতম গরবা অনুষ্ঠানে অমুসলিমদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে তাঁরা সরকার ও আয়োজকদের নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। কোনো অমুসলিমকে অনুষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে তাঁরা প্রতিবাদ করবেন বলেও জানান তিনি।
এই বক্তব্যের পর ঘটনাটি আরও স্পষ্টভাবে ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একদিকে আয়োজকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অংশগ্রহণ সীমিত করার অবস্থান—দুইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বক্তব্য ও আয়োজকদের অভিযোগের বাইরে এ ঘটনায় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। হুমকির অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
গরবা উৎসবের ঐতিহ্য ও সামাজিক গুরুত্ব
গরবা মূলত ভারতের গুজরাটে জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। রাজস্থানসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলেও নবরাত্রি উৎসবের সময় এর আয়োজন করা হয়। দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই নৃত্যে সাধারণত অংশগ্রহণকারীরা বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে সংগীতের তালে নাচেন। অনেক অনুষ্ঠানে গরবার পাশাপাশি ডান্ডিয়া নৃত্যেরও আয়োজন থাকে।
ধর্মীয় তাৎপর্যের কারণে নবরাত্রির সময় গরবা বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে অনেক এলাকায় এসব অনুষ্ঠান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ এতে অংশ নেন। পাশাপাশি সংগীতশিল্পী, আয়োজক, টিকিট বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরও এসব আয়োজনের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকে।
এ কারণে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হলে তার প্রভাব শুধু মঞ্চে পরিবেশনা না হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দর্শকদের পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে এবং শিল্পীদের পেশাগত কাজেও বিঘ্ন ঘটে।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
জয়পুরে জাভেদ খানের পরিবেশনা বাতিলের ঘটনা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একটি ধর্মীয় উৎসবের নিজস্ব ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি হুমকি বা চাপের মুখে কোনো শিল্পীকে অনুষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়াতে হলে তা জনপরিসরে নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও সামনে আনে।
শিল্পীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ এবং আয়োজকদের নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান পরিচালনা করার নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়।
জাভেদ খানের এই ঘটনা তাই কেবল দুটি গরবা অনুষ্ঠানে তাঁর অংশগ্রহণ বাতিল হওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পীর পেশাগত স্বাধীনতা, আয়োজকদের নিরাপত্তা, আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানের প্রশ্ন।
এখন হুমকির অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন নির্বিঘ্নে পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।


