কক্সবাজার শহরে পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও প্রেসক্লাবের ঠিক সামনের একটি অভিজাত ভবনের নবম তলার ফ্ল্যাট থেকে তিন লাখ পিস ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মাদক ঢাকায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে ওই ফ্ল্যাটে মজুত করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে সোমবার (১৯ অক্টোবর) ভোর ৪টা পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার নিউ সার্কিট হাউস রোডে অবস্থিত কোরাল রিপ পূর্বিতা সুলতান ভিলার নবম তলার ৮/এ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। ভবনটি পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও কক্সবাজার প্রেসক্লাবের ঠিক সামনেই অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থাপনার কাছাকাছি এমন একটি ভবনে বিপুল পরিমাণ মাদক মজুতের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন শরীয়তপুরের আরমান বয়াতী (২৭), পিরোজপুরের মো. শামীম (৩০) এবং ভোলার মো. রাকিব (২৫)।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আলী জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের তিনটি বিশেষ দল যৌথভাবে ফ্ল্যাটটিতে অভিযান চালায়। তল্লাশির একপর্যায়ে শয়নকক্ষের একটি কেবিনেটের ভেতরে রাখা দুটি কালো ট্রাভেল ব্যাগের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্যাগ দুটির ভেতরে খাকি রঙের টেপে মোড়ানো ৩০টি প্যাকেট ছিল। এসব প্যাকেট থেকে তিন লাখ পিস ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি মোবাইল ফোনও জব্দ করেছে পুলিশ।
ঢাকায় পাঠানোর জন্য মজুতের অভিযোগ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মাদক টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে সেগুলো ঢাকার কেরানীগঞ্জের মো. রাহাদ হোসেন (২৬) নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। এ উদ্দেশ্যেই ফ্ল্যাটটিতে ইয়াবা মজুত করা হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, রাহাদ হোসেনের নামেই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযানের সময় তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা এবং মাদক সংগ্রহ, মজুত ও পরিবহনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তদন্ত চলছে।
গ্রেপ্তার আরমান বয়াতী সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, এর আগেও তিনি রাহাদ হোসেনের কাছে ইয়াবা পাঠিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই লাখ পিস করে মোট ১০টি চালানে ২০ লাখ পিস ইয়াবা ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তবে এসব চালানের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দাবিটির সত্যতা যাচাই এবং আগের চালানগুলোর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে পুলিশ
ফ্ল্যাটটিতে কারা নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং সেখানে মাদক মজুতের কার্যক্রম কত দিন ধরে চলছিল, তা জানতে ভবনটির গত এক মাসের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি মাদক সরবরাহের সম্ভাব্য পথ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার তিনজন এবং পলাতক রাহাদ হোসেন পরস্পরের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাটটি ইয়াবা মজুত ও কেনাবেচার কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। তবে এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদকের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা, টেকনাফ থেকে কক্সবাজার শহর হয়ে ঢাকায় সরবরাহের নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য অর্থ লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ। একই সঙ্গে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া, সেখানে কারা যাতায়াত করতেন এবং মাদক পরিবহনে আরও কেউ সহযোগিতা করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও প্রেসক্লাবের ঠিক সামনের ভবনে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা মজুতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থাপনার সামনে অবস্থিত ভবনে মাদক মজুত ও ব্যবসা করার সাহস দেখানো থেকে কারবারিদের বেপরোয়া মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাঁর মতে, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধারের জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে কক্সবাজার শহরে আরও মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এসব চক্রকে শনাক্ত করতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
কক্সবাজার শহরকে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মমতাজ উদ্দিন বাহারী। তাঁর অভিযোগ, শহরের কিছু অভিজাত ভবনে বড় মাদক কারবারিদের বসবাসের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। বেশি ভাড়ার বিনিময়ে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া এবং ভাড়াটিয়াদের পরিচয় ও কার্যক্রম যথাযথভাবে যাচাই না করার সুযোগে এসব স্থাপনা মাদক মজুত ও পাচারের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য এবং সাংবাদিকদের কেউ কেউ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পেশা, পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাদক পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত নজরদারির প্রয়োজন
কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারসংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে টেকনাফ ও আশপাশের সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক পরিবহনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এ ধরনের পাচার প্রতিরোধে শুধু সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়; শহরের আবাসিক ভবন, ভাড়া করা ফ্ল্যাট, পরিবহনব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য গুদাম হিসেবেও ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারি জরুরি।
তবে কোনো ভবন বা এলাকার অবস্থানকে এককভাবে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কার্যকর তদন্তের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠা করা।
কক্সবাজারের এই ঘটনায় তিন লাখ পিস ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট উদ্ধারের পাশাপাশি একটি সম্ভাব্য আন্তজেলা মাদক সরবরাহ নেটওয়ার্কের বিষয়ে তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পলাতক সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা, আগের চালানগুলোর সত্যতা যাচাই এবং মাদকের উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, উদ্ধার করা মাদকের উৎস, ঢাকায় সরবরাহের পরিকল্পনা এবং ফ্ল্যাটটি ব্যবহারের পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তদন্তকারীরা কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নজরদারি ও ভাড়াটিয়া যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায় কি না, সেটিও আলোচনায় থাকবে।


