খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
নারায়ণগঞ্জ শিল্পনগরীতে গত এক মাসে ভয়াবহ ডাকাতি, সশস্ত্র হামলা এবং পুলিশের সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার পাঁচটি উপজেলায় অন্তত ১৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে আড়াইহাজার, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
বিশেষ করে আড়াইহাজার উপজেলায় এক মাসে ১০টির বেশি বাড়িতে মুখোশধারী সশস্ত্র ডাকাতরা হামলা চালায়। ৮ এপ্রিল বিশনন্দী ইউনিয়নে একই রাতে তিনটি বাড়িতে একযোগে ডাকাতি সংঘটিত হয়, যেখানে স্থানীয়রা ব্যাপক আতঙ্কের মধ্যে পড়ে। মহাসড়ক এলাকাগুলোতেও অপরাধীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২১ এপ্রিল ভোরে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের সাওঘাট এলাকায় প্রবাসফেরত এক নারীর গাড়িতে ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি করা হয়। ওই ঘটনায় ছয় ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা লুট হয় এবং তিনি আহত হন।
ফতুল্লায় এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে কোটি টাকার মালামাল লুটের ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সোনারগাঁয়ে একটি নগদ বিতরণ কেন্দ্র থেকে ফিল্মি কায়দায় সাত লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
| তারিখের সময়কাল | এলাকা | ঘটনার ধরন | ক্ষতির পরিমাণ/বিবরণ |
|---|---|---|---|
| ২৬ মার্চ–২৬ এপ্রিল | আড়াইহাজার | একাধিক ডাকাতি | ১০টির বেশি বাড়িতে হামলা |
| ৮ এপ্রিল | বিশনন্দী | একযোগে ডাকাতি | তিনটি বাড়িতে লুটপাট |
| ২১ এপ্রিল | ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক (সাওঘাট) | সশস্ত্র ডাকাতি | স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা লুট |
| এপ্রিল মাস | ফতুল্লা | বাড়িতে ডাকাতি | কোটি টাকার মালামাল লুট |
| এপ্রিল মাস | সোনারগাঁ | নগদ কেন্দ্র ডাকাতি | সাত লাখ টাকা লুট |
| মার্চ–এপ্রিল | বিভিন্ন এলাকা | মোট ডাকাতি | ১৮টি ঘটনা |
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক ভুক্তভোগী থানায় মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, মামলা করলে হয়রানি বাড়ে এবং হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এমনই অভিজ্ঞতা জানিয়ে এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, পূর্বে মামলা করে কোনো সুফল না পাওয়ায় এবার তিনি মামলা করেননি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠনের স্থানীয় প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের এই অনাস্থা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, বিচার পাওয়ার চেয়ে হয়রানির ভয় যখন বেশি হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এদিকে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত এক মাসে ডাকাতির ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই অভিযান চালিয়ে প্রস্তুতিকালীন অবস্থায় অপরাধীদের আটক করা হয়েছে।
অপরদিকে জেলার থানা এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গত দুই বছরে অন্তত পাঁচটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে কিছু থানা প্রাঙ্গণ থেকেই সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ সদস্যরাই এসব ঘটনার ভুক্তভোগী হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটেছে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ে। গত ৩০ এপ্রিল বন্দরের একটি এলাকায় তদন্তে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয় এবং একটি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে মার্চ মাসে শহরের একটি এলাকায় পুলিশের আরেকটি অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয় এবং কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।