খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বরাবরই উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী—কিছু অঞ্চলে নারী ভোটার সংখ্যায় পুরুষদেরও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দল একটিও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর ও লজ্জাজনক কাঠামোগত বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নারীশূন্য রাজনীতির প্রশ্নে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে একটি নীরব কিন্তু সুস্পষ্ট ঐক্য দৃশ্যমান।
জামায়াতে ইসলামী ২৭৬ জন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েও একজন নারীকে যোগ্য মনে করেনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮ জন প্রার্থী দিয়েও নারী নেতৃত্বের জন্য দরজা বন্ধ রেখেছে।
খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের অবস্থানও একই।
এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি একটি সচেতন, পরিকল্পিত ও কাঠামোগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা নারীদের রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকারকে অস্বীকার করে।
সংবিধান ও বাস্তবতার সংঘাত
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগে সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই উপলব্ধি থেকেই যে, রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন অসম্ভব।
কিন্তু যে দলগুলো একটি নারী প্রার্থীও দেয় না, তারা কার্যত ঘোষণা দেয়—
নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নয়।
এটি শুধু সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, এটি গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো প্রতিনিধিত্ব—যেখানে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত, সেখানে গণতন্ত্রও অসম্পূর্ণ।
ধর্মের দোহাই ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি
এই বৈষম্যকে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে নারীরা শিক্ষা, ব্যবসা, সমাজ সংস্কার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলাম নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে, নাগরিক অধিকার দিয়েছে—রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব থেকে তাদের বাদ দেওয়ার কোনো ধর্মীয় ফরজ বা অনুশাসন নেই।
সুতরাং নারীদের সংসদীয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখা কোনো ধর্মীয় নির্দেশনা নয়; এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল—যা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
নারী ভোট গ্রহণযোগ্য, নারী নেতৃত্ব নয়—এই দ্বিচারিতা
এই দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান একটি ভয়ংকর দ্বিচারিতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরে—
নারীর ভোট প্রয়োজন, কিন্তু নারীর নেতৃত্ব অগ্রহণযোগ্য।
নারীরা কেবল ব্যালট বাক্স পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য, ক্ষমতার টেবিলে নয়—এই ধারণাই কট্টর রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। এটি নারীর অধিকার প্রশ্নে একটি স্পষ্ট পশ্চাদপসরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত।
সামাজিক আশঙ্কা ও রাজনৈতিক পরিণতি
এই বাস্তবতায় শ্রমজীবী নারী, নারী উদ্যোক্তা, নারী কৃষক, পোশাকশ্রমিক ও পেশাজীবী নারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা—
যেসব রাজনৈতিক শক্তি নারীর নেতৃত্ব মানতে পারে না, তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে নারীর কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার কতটা নিরাপদ থাকবে?
এই আশঙ্কা কোনো কল্পনাপ্রসূত ভয় নয়; এটি নির্বাচনী বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা যৌক্তিক উদ্বেগ। যখন কোনো দল সংসদ নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয় না, তখন তারা কার্যত ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি রূপরেখা ঘোষণা করে দেয়—যেখানে নারীরা নীতিনির্ধারক নয়, বরং নীরব অনুসারী।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে
নারীশূন্য রাজনীতিকে স্বাভাবিক করার যে নীরব ঐক্য ইসলামী দলগুলো গড়ে তুলছে, তা শুধু নারীর অধিকার নয়—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা—রাষ্ট্র ক্ষমতা পুরুষের, নারীর ভূমিকা সীমিত।
এই বার্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আজ কেবল নারী অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্র, সংবিধান ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক
খবরওয়ালা / জি-লাইভ