নিউক্লিয়ার নয় আমাদের দরকার কিউবিট ক্যাপাসিটি

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর যুদ্ধের পর পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এক আবেগসর্বস্ব ও ঐতিহাসিক হুংকার ছেড়েছিলেন: “ভারত যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তবে আমরা প্রয়োজনে ঘাস কিংবা পাতা খেয়ে থাকব, তবুও আমরা আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক বোমা তৈরি করব।” পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রীয় দর্শনে এই আত্মঘাতী জেদটিকেই শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিল। পাকিস্তান পরমাণু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হয়েছে বটে, তবে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশটির পরিণতি ঠিক সেই ঘোষণামাফিকই দাঁড়িয়েছে। তাদের সাধারণ মানুষ আজ আক্ষরিক অর্থেই আটার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারাচ্ছে, অথচ তাদের অস্ত্রাগারে শোভা পাচ্ছে পারমাণবিক ওয়ারহেড।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকদের জীবনমান, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে, কোনো মারণাস্ত্রের ওপর নয়। পাকিস্তান নিজের অর্থনীতি ও মানুষের মৌলিক চাহিদা বিসর্জন দিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটি কৃত্রিম ও স্থায়ী যুদ্ধাবস্থার নীতি গ্রহণ করে। এর ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের পরিচিতি দাঁড়িয়েছে “এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা” নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক জাতি হিসেবে। তাদের পাসপোর্ট আজ বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ের তলানিতে, আর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিক্ষাবৃত্তির দায়ে আটক হওয়ার ঘটনা নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হয়। এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনৈতিক জেদ যখন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন পারমাণবিক বোমাও একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করতে পারে না।

এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা: পাকিস্তান মডেলের মরীচিকা

১৯৭১ সালে যখন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে, তখন বিশ্বমঞ্চে অনেকেই এই ভূখণ্ডের টিকে থাকা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোষাগার শূন্য করে সমস্ত সম্পদ পশ্চিমে পাচার করার কারণে স্বাধীনতার ঠিক পরমুহূর্তে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৮.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ১০.৬৭ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের অর্থনীতি তখন আমাদের চেয়ে শক্তিশালী তো ছিলই, উপরন্তু তাদের অনুকূলে ছিল শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক লবির জোরালো সমর্থন। কিন্তু পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশকে সামরিক উন্মাদনা বনাম অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার এই দুই বিপরীতমুখী দর্শনের কারণে দুই দেশের গতিপথ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (IMF) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-র সাম্প্রতিক অফিশিয়াল ডেটা এই ঐতিহাসিক ব্যবধানকে এক নির্মম বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে:
  • মাথাপিছু জিডিপি (Nominal GDP per capita): আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অফিশিয়াল ডেটা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২,৫২০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি সংকুচিত হয়ে নেমে এসেছে মাত্র ১,৪৭১ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানগতভাবেই একজন বাংলাদেশি নাগরিকের গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা একজন পাকিস্তানির চেয়ে প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি।
  • মুদ্রার সার্বভৌমত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির অভিঘাত: যেখানে ১ মার্কিন ডলারে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, সেখানে ১ ডলার কিনতে পাকিস্তানি রুপি কিনতে হচ্ছে রেকর্ড চড়া দামে। এই মুদ্রার অবমূল্যায়নের চেয়েও বড় বিপর্যয় হলো পাকিস্তানের আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। দেশটিতে গড় মুদ্রাস্ফীতি একসময় প্রায় চতুর্থাংশের ঘরে পৌঁছানোয় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অর্থনীতিকে তুলনামূলক সহনশীল পর্যায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
  • বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের পুষ্টি: পাকিস্তানের রপ্তানি আয় যখন স্থবির হয়ে আছে, তখন তৈরি পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তান যখন তার দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে নামমাত্র রিজার্ভ ধরে রাখতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে চড়া সুদে ঋণ রোল-ওভার করার আকুতি জানিয়েছে, বাংলাদেশ তখনো নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সক্ষমতায় বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন সচল রেখেছে।
  • সামাজিক সূচক ও মানব উন্নয়ন (HDI): রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের চরম ব্যর্থতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয় তাদের মানব সম্পদ উন্নয়নের সূচকে। ইউএনডিপি-র মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) বাংলাদেশ মাঝারি মানব উন্নয়ন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে, যা পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু যেখানে সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে, পাকিস্তানের মানুষের গড় আয়ু ও শিশু মৃত্যুর হার বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ভুল অগ্রাধিকারের অনিবার্য ফল। পাকিস্তান যখন পরমাণু অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভারতের সাথে ছায়াযুদ্ধ বজায় রাখতে তাদের বাজেটের সিংহভাগ অনুৎপাদনশীল সামরিক খাতে অপচয় করেছে, বাংলাদেশ তখন নিঃশব্দে প্রাথমিক শিক্ষা, তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
আজ পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে যখন আন্তর্জাতিক সংস্থার কঠোর শর্তের নিচে পিষ্ট হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এক প্রকার “আর্থিক সাহায্যপ্রার্থী” রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সেখানে ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতি হিসেবে মহাকাশ ও ডিপ-টেক প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, সামরিক উন্মাদনা কিংবা পারমাণবিক বোমার ভয় দেখিয়ে কোনো রাষ্ট্র টেকসই রূপান্তর ঘটাতে পারে না, যদি না তার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তির ভিত মজবুত থাকে।

দেশীয় ছদ্ম-বুদ্ধিবৃত্তিক উন্মাদনা এবং ৪,১৫৬ কিলোমিটারের বাস্তব সীমান্ত

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজের কিছু অতিউৎসাহী গোষ্ঠী এবং সুযোগসন্ধানী মহল এখনো এই পাকিস্তান মডেলের আফিম গিলতে চায়। তারা এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা, অলীক কল্পনা ও যুদ্ধোন্মাদনায় ভোগেন। এই উন্মাদ জনতা প্রায়ই সুদূর আফগানিস্তান বা ইরানে আমেরিকার তথাকথিত পরাজয় কিংবা পিছু হটার গল্প শুনে রাস্তায় নেমে উল্লাস করে। কিন্তু এই সহজ সমীকরণটি বোঝার মতো নূন্যতম কাণ্ডজ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা তাদের নেই যে—আফগানিস্তান বা ইরানের ভৌগোলিক আকার, ভূকৌশলগত অবস্থান আর তাদের মাটির নিচের বিপুল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ কোনোটার সাথেই বাংলাদেশের বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল নেই।
পাহাড়-পর্বতে ঘেরা দুর্গম আফগানিস্তান কিংবা খনিজ তেলে সমৃদ্ধ ইরান বছরের পর বছর যুদ্ধ করেও যেভাবে টিকে থাকতে পেরেছে, বাংলাদেশ কি তা পারবে? যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ওইসব দেশের সাধারণ মানুষের যে চরম দুরবস্থা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে—তা বিবেচনা করার ক্ষমতাও এই ধর্মান্ধদের নেই। তারা উন্মাদের মতো সর্বক্ষণ একটা কাল্পনিক ও জেহাদি যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা করে। অথচ তাদের মগজে এই ভাবনার ক্ষমতাটুকু নেই যে, আমাদের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ, ভৌগোলিকভাবে সমতল এবং অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশ সামান্য কোনো যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের ধাক্কাও সইতে পারবে না। গত কয়েক দশকে আমরা কষ্ট করে যতটুকু কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছি, আমাদের যে রেমিট্যান্স, পোশাক খাত আর উদীয়মান অর্থনীতি—তার সবকিছু এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।
এই গোষ্ঠীটি আসলে চায় বাংলাদেশ যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি—”সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”—সম্পূর্ণ ত্যাগ করে। তারা আমাদের স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ অবস্থানকে বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে বলে; অর্থাৎ নিজেদের সার্বভৌমত্ব বন্ধক রেখে কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বা সামরিক বলয়ের দাসত্ব বরণ করতে উস্কানি দেয়। এমনকি পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘ভাড়াটে সৈন্য সাপ্লাই ব্যবসা’ কিংবা ‘মোল্লা-মিলিটারি রিজিম’ বা উগ্র ডানপন্থী-সামরিক আঁতাত ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে তাদের মনে কোনো দ্বিধা নেই।
এই উন্মাদদের কে বোঝাবে যে, যে দেশের সাথে আমাদের প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটারের একটি বিশাল, জটিল এবং তিন দিক থেকে বেষ্টিত স্থল সীমান্ত রয়েছে, তাদের সাথে কোনো প্রকার স্থায়ী যুদ্ধাবস্থা বা বৈরিতা বজায় রেখে একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব? পাকিস্তান ও ভারতের বর্ডারের দৈর্ঘ্য মূলত জনমানবহীন মরুভূমি, পাহাড় আর সমতল সীমান্ত। সেই সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়েই পাকিস্তানের অর্থনীতি আজ পঙ্গু। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিন দিকের সীমান্ত তো বটেই, সাথে রয়েছে এক দীর্ঘ নদী ও ভূ-প্রাকৃতিক জটিলতা। শত্রুদেশের চিরস্থায়ী বৈরিতা মাথায় রেখে যেভাবে হাই-অ্যালার্ট সীমান্ত পাহারা দিতে হয়, ৪,১৫৬ কিলোমিটার জুড়ে আমরা যদি তেমন সামরিক শক্তির মহড়া ও প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে যাই, তবে আমাদের জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ কেবল অনুৎপাদনশীল সামরিক খাতেই গ্রাস হয়ে যাবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বাজেট কাটছাঁট করতে করতে দেশের মানুষের হাতে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মতোই ভিক্ষার থালা উঠবে।
তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত এই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে বাস্তবসম্মত ভূ-রাজনীতি বা ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik)-এর একমাত্র অমোঘ সমীকরণ হলো—ভারতের সাথে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। সংঘাত নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এই ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তকে স্থায়ী যুদ্ধের ক্ষত না বানিয়ে একে ব্যবহার করতে হবে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর, ট্রানজিট ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার সংযোগ সড়ক হিসেবে। এই করিডোর ও মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে আমাদের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। বন্দুকের নল উঁচিয়ে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার চেয়ে বাণিজ্যের ইন্টারকানেক্টিভিটি বা পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করা অনেক বড় কূটনৈতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এই বিংশ শতাব্দীর আদিম মানসিকতা পোষণ করলে এই একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। আজকের যুগে জাতীয় নিরাপত্তা আর কোনো পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধবিমান বা দূরপাল্লার ট্যাঙ্কের লোহার ওজনের ওপর নির্ভর করে না; কারণ এগুলো শুধু একটি ভূখণ্ডকে ধ্বংস করতে পারে, কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনে দিতে পারে না। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার আসল গ্যারান্টি হলো একটি শক্তিশালী, জ্ঞানভিত্তিক, এবং প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলা। কোনো দেশের সামরিক বাহিনী যদি আমাদের সীমান্তে চোখ তুলে তাকাতেও চায়, তবে যেন তারা বুঝতে পারে যে এই দেশের অর্থনৈতিক ও কোয়ান্টাম ডেটা আর্কিটেকচারকে স্পর্শ করলে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন চিরতরে ভেঙে পড়বে। এই স্তরের কম্পিউটেশনাল ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হলো আসল সার্বভৌমত্ব।

নিউক্লিয়ার বনাম কিউবিট ক্যাপাসিটি: শক্তির নতুন সমীকরণ

আমাদের বুঝতে হবে, শক্তির চিরন্তন সংজ্ঞাটাই এখন বদলে গেছে। যখন পারমাণবিক বোমার বদলে কিউবিট ক্যাপাসিটি (Qubit Capacity)-র কথা বলা হয়, তখন অনেকে হয়তো অবাক হন। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, পারমাণবিক বোমার পুরো ধারণাটাই আসলে চরম ধ্বংসাত্মক। একটা পরমাণু বোমা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, লাখ লাখ প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু তা কোনো নতুন মূল্য, সম্পদ বা মানুষের বেঁচে থাকার রসদ তৈরি করতে পারে না। এর শেষবিন্দু হলো কেবল ধ্বংস।
অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল একক ‘কিউবিট’ (Qubit)-এর ভেতরের শক্তিটা একদম বিপরীত—এটি সৃজনশীল ও বহুমাত্রিক। আমাদের চেনা প্রথাগত কম্পিউটার যেখানে সাধারণ বাইনারি বিটের সমীকরণ ধরে একমুখী লাইনে কাজ করে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেখানে সুপারপজিশন এবং এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো জটিল পদার্থবিদ্যার নিয়ম খাটিয়ে একই সাথে কোটি কোটি গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাকে পরখ করতে পারে। সাধারণ সুপারকম্পিউটারের যে হিসাব মেলাতে হাজার বছর লাগবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা চোখের পলকে সমাধান করে ফেলে।
বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হতো কার কত বড় পারমাণবিক অস্ত্রাগার আছে, কার কয়টা দূরপাল্লার মিসাইল আছে কিংবা কার মাটির নিচে কতটা খনিজ তেলের খনি লুকিয়ে আছে তার ওপর। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই পুরোনো শক্তির সমীকরণটা পুরোপুরি তামাদি হয়ে গেছে। আজকের ভূ-রাজনীতি আর মানচিত্রের কাঁটাতার কিংবা ভূখণ্ডের সীমানায় আটকে নেই; ক্ষমতার খেলাটা এখন সিলিকন চিপ আর কিউবিটের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্তরে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান যে আদিম সামরিক মডেলের মরীচিকার পেছনে অন্ধের মতো ছুটে নিজের অর্থনীতিকে দেউলিয়া করেছে, সেই মডেল আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই চরম হাসির খোরাক। আধুনিক বিশ্বে একটা দেশের সার্বভৌমত্ব, তার সম্মান আর দরকষাকষির ক্ষমতা এখন আর কামানের গোলার ওজনে মাপা হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার কম্পিউটেশনাল সুপ্রিমেসি বা গাণিতিক ও প্রসেসিং সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে।
ভেবে দেখুন, আজকের দিনে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর নীতিনির্ধারকরা কিন্তু পারমাণবিক বোমার সংখ্যা গোনার চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত সেমিকন্ডাক্টর চিপের সাপ্লাই চেইন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে একেই এখন বলা হচ্ছে ‘চিপ-রাজনীতি’ বা Chiplomacy। এই নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের মূল দর্শনটা খুব পরিষ্কার—যে দেশ আল্ট্রা-অ্যাডভান্সড সেমিকন্ডাক্টরের লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম প্রসেসিংয়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, আগামী পৃথিবীর অর্থনীতি ও নিরাপত্তার নতুন ব্যাকরণ মূলত তারাই লিখে দেবে।
আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতি আর খনিজ তেল, কয়লা কিংবা প্রথাগত গায়ের জোরের ওপর ভর করে চলবে না; তা চলবে খাঁটি কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার ওপর। যে দেশের হাতে যত শক্তিশালী ‘কিউবিট ক্যাপাসিটি’ থাকবে, তারা তত দ্রুত নিখুঁত সব ন্যানো-মেটেরিয়াল তৈরি করতে পারবে, প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ আবিষ্কার করবে, বৈশ্বিক ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটের গতিবিধি আগে থেকে নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করে নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা চাইলে যেকোনো শত্রু দেশের সাইবার ডিফেন্স বা ব্যাংকিং এনক্রিপশন সিস্টেমকে এক সেকেন্ডে অচল করে দিয়ে ঘরে বসেই পুরো যুদ্ধ জয় করে নিতে পারবে—কোনো রক্তপাত ছাড়াই।
পারমাণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতা যেখানে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আঘাত হানতে পারে, কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনের ক্ষমতা সেখানে পুরো বিশ্বের ডিজিটাল এবং ফাইন্যান্সিয়াল পরিকাঠামোকে ঘরে বসেই পুনর্গঠন বা স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি একটি পরমাণু বোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি টেকসই এবং শক্তিশালী। তাই তরুণ প্রজন্মকে যুদ্ধের উস্কানি না দিয়ে, সস্তা চিল্লানো রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই চূড়ান্ত অস্ত্র, অর্থাৎ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উপযোগী করে তোলাই হলো আসল প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল।

চিপ-রাজনীতি ও এশীয় অক্ষের রূপান্তর: হার্ডওয়্যারের নতুন একচেটিয়া বাজার

আমাদের মনে একটা ভুল ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, তথ্যপ্রযুক্তির শেষ কথা বুঝি আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি। কিন্তু ভেতরের আসল সত্যটা হলো, সিলিকন ভ্যালি যতই চোখধাঁধানো সফটওয়্যার বা জেনারেটিভ এআই তৈরি করুক না কেন—সেগুলোর ভৌত অস্তিত্ব, প্রাণশক্তি আর প্রসেসিং ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এশীয় অক্ষের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা বিশ্ব অ্যালগরিদম বা কোড লিখতে পারে, কিন্তু সেই কোডকে বাস্তবে সচল করার মতো রক্ত-মাংসের অবকাঠামো বা হার্ডওয়্যার তাদের নেই।
আজকের বৈশ্বিক চিপ-রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য অপরিহার্য বিশ্বের সবচেয়ে জটিল, সূক্ষ্ম এবং উন্নত প্রসেসরগুলোর নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট পশ্চিমে তৈরি হলেও, সেগুলোর ভৌত উৎপাদন ম্যানুফ্যাকচারিং কিন্তু আমেরিকায় হয় না; তা হয় তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC) এর ল্যাবরেটরিতে। শুধু তাই নয়, এর সাথে যদি দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তৈরি করা বিশেষায়িত মেমোরি চিপ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সমস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাকা রাতারাতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। গোটা সিলিকন ভ্যালি তখন স্রেফ একটি অচল খেলনায় পরিণত হবে।
সবচেয়ে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, হার্ডওয়্যার ও ভৌত পরিকাঠামোর ওপর এশিয়ার এই যে অভূতপূর্ব একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, এটি কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বা সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। এটি অর্জিত হয়েছে গত দুই থেকে তিন দশক ধরে এশিয়ার এই দূরদর্শী দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে।
যখন আমাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান সীমান্ত যুদ্ধের সস্তা উত্তেজনায় মেতে অবাস্তব সামরিক বাজেটের পেছনে নিজেদের রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢালছিল, তখন এশিয়ার এই প্রকৃত পরাশক্তিরা সীমান্ত রেখার উন্মাদনা ভুলে নিঃশব্দে সেমিকন্ডাক্টর, লিথোগ্রাফি আর কম্পিউটেশনাল পরিকাঠামো গড়ে তুলছিল। তারা বন্দুকের চেয়ে সিলিকনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। এই চিপ-রাজনীতি আজ বিশ্বমঞ্চে বুক ঠুকে প্রমাণ করে যে, একবিংশ শতাব্দীতে শক্তির আসল উৎস আর বন্দুকের নলে নেই, তা স্থানান্তরিত হয়েছে সিলিকন ওয়েফারের কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক ট্রানজিস্টরে। আর এই শক্তির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, আগামী পৃথিবীর শাসনভারও থাকবে তার পকেটেই।

চীন ও ভারতের নিজস্ব ইকোসিস্টেমের উত্থান এবং এশীয় মডেল

এই বৈশ্বিক কম্পিউটেশনাল রেসের লড়াইয়ে আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ—চীন ও ভারতের অবস্থান এবং তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার গল্পটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় এবং বাস্তবসম্মত শিক্ষণীয় কেস স্টাডি। এটি আমাদের শেখায় যে, সদিচ্ছা আর সঠিক দূরদর্শিতা থাকলে কীভাবে বিশ্বমঞ্চে বুক টান করে দাঁড়ানো যায়।
আমেরিকার কঠোর প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা, চিপ বয়কট এবং একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়েও চীন যেভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ক্ষমতার পুরো ভারসাম্যকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব ভেবেছিল মূল চিপ তৈরির লিথোগ্রাফি মেশিন সরবরাহ বন্ধ করে দিলে চীন প্রযুক্তির রেস থেকে ছিটকে যাবে। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে চীন তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ মেধা খাটিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর তৈরি করে দেখিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কোয়ান্টাম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এই মূল দৌড়ে চীন আজ পরাশক্তি আমেরিকার একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অন্যদিকে, আমাদের পাশের দেশ ভারত বিশ্বকে এক অনন্য মানবিক ও ডিজিটাল রূপান্তরের গল্প দেখিয়েছে। ভারত প্রমাণ করেছে, কীভাবে একটি বিশাল জনশক্তিকে সস্তা আইটি আউটসোর্সিং বা কল সেন্টারের প্রাথমিক স্তর থেকে টেনে তুলে উন্নত ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (DPI) রূপান্তর করা যায়। ভারতের তৈরি ‘UPI’ (Unified Payments Interface) এবং তাদের সামগ্রিক ‘India Stack’ আজ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল গভর্নেন্স এবং ফিনটেক বিপ্লবের প্রধানতম রোল মডেল। ভারত আজ আর পশ্চিমাদের তৈরি প্রযুক্তির সাধারণ উপভোক্তা নয়; তারা নিজস্ব ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশন’ চালু করে কিউবিট ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
ভারত ও চীনের এই অভাবনীয় উত্থান আমাদের চোখের সামনে একটি সত্যকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেয়—এশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং তার সার্বভৌমত্ব নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে; প্রতিবেশী দেশের সাথে অবাস্তব ও কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা বজায় রেখে নয়। মেধা আর প্রযুক্তির এই নতুন এশীয় মডেলকে আপন করে নেওয়াই এখন বাংলাদেশের জন্য টিকে থাকার একমাত্র বাস্তব পথ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক জাম্প এবং কোয়ান্টাম অর্থনীতির দিকে যাত্রা

একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি শান্ত, অথচ জাঁদরেল অর্থনৈতিক রূপান্তর চোখে পড়ে। ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো কোনো ধরনের সস্তা ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল, কিংবা ফাঁকা বুলি আর আদর্শিক কাদা-ছোড়াছুড়িতে নিজেদের জড়ায়নি। তারা একদম ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর এবং গ্রিন-টেক ভ্যালু চেইনের সাথে আঠার মতো গেঁথে নিয়েছে।
বৈশ্বিক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যখন একক চীন-নির্ভরতা কাটানোর জন্য বিকল্প বাজারের খোঁজ শুরু করল—ভিয়েতনাম তখন এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সুযোগটি দুই হাতে লুফে নিল। রাতারাতি আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালির জটিলতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম বড় ইলেকট্রনিক্স আর চিপ অ্যাসেম্বলি হাবে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তারা দিয়েছে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। তরুণ প্রজন্মকে প্রথাগত সস্তা ফ্রিল্যান্সিং বা ডাটা এন্ট্রি থেকে টেনে বের করে সরাসরি ঢুকিয়ে দিয়েছে অ্যাডভান্সড হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং আর সেমিকন্ডাক্টর আর্কিটেকচারের দুনিয়ায়।
এই উদীয়মান দেশগুলো খুব ভালো করে একটি সত্য টের পেয়ে গেছে—আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে যদি মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হয়, তবে নিজেদের এখনই ‘কোয়ান্টাম অর্থনীতি’র (Quantum Economy) জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার যখন ল্যাবরেটরির চার দেয়াল ভেঙে বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে বাজারে নামবে, তখন আমাদের চেনা প্রথাগত লজিস্টিকস, ব্যাংকিং খাতের এনক্রিপশন, সাইবার সিকিউরিটি আর গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের পুরো খোলনলচেই রাতারাতি ওলটপালট হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতা ও কাঠামোগত সংকট

সিলিকন আর কিউবিটের এই বৈশ্বিক মহাপরিবর্তনের বিপরীতে আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক কোথায়? কোনো মেকি আত্মতুষ্টি বা আবেগের চশমা ছাড়াই অত্যন্ত নির্মোহভাবে এই সত্যটা আজ আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।
বিগত দেড় দশকে দেশের প্রযুক্তি খাতে ডিজিটাল রূপকল্পের হাত ধরে সাধারণ মানুষের দৈনিক যাপিত জীবনে একটি বিশাল ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফাইবার অপটিক কেবল পৌঁছে দেওয়া, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেটে ব্যাংক পৌঁছে দেওয়া কিংবা সরকারি সেবাগুলোকে ডিজিটালাইজ করা—এগুলো নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু সমস্যা হলো, ঐতিহাসিকভাবে আমরা এতটাই পেছনে ছিলাম যে, এই অগ্রগতির পরও এশিয়ার অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি আমরা পৌঁছাতে পারিনি।
কেন এই ব্যবধান রয়ে গেছে? কারণ, কৌশলগত জায়গা থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় অন্ধবিন্দু হলো—আমরা একটি চমৎকার ‘কনজিউমার সোসাইটি’ বা প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সমাজ তৈরি করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু কোনো ‘ইনোভেশন ইকোনমি’ বা প্রযুক্তি উৎপাদনকারী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের পুরো আইটি মডেলটা দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত ভঙ্গুর আর সস্তা শ্রমের ওপর। এশিয়ার অন্য দেশগুলো যখন সেমিকন্ডাক্টর, সুপারকম্পিউটিং আর কোয়ান্টাম ডিফেন্সের মতো উচ্চ-মূল্যের পরিকাঠামো নিয়ে খেলছে, আমরা তখনো কেবল পশ্চিমাদের তৈরি করা প্রযুক্তির একজন সাধারণ উপভোক্তা হিসেবে রয়ে গেছি।

ট্রাডিশনাল ফ্রিল্যান্সিং মডেলের সীমাবদ্ধতা

আমরা প্রায়শই গর্ব করে বলি যে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ অন্যতম বড় ডিজিটাল শ্রম সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু এই অর্জনের পেছনের নির্মম সত্যটা হলো, আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের সিংহভাগই মূলত স্বল্প ও মাঝারি দক্ষতার কাজের ওপর নির্ভরশীল। ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ ওয়ার্ডপ্রেস কাস্টমাইজেশন বা প্রথাগত সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের মতো কাজগুলো দিয়েই আমাদের আইটি রেমিট্যান্সের চাকা সচল রয়েছে। বর্তমান সময়ে অ্যাডভান্সড কোডিং এজেন্ট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় হাতিয়ারগুলোর কারণে এই প্রথাগত কাজগুলোর চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের তরুণরা যেখানে দ্রুত ক্লাউড আর্কিটেকচার, ডেটা সায়েন্স আর সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের দিকে নিজেদের আপস্কিল করে ফেলেছে, আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো পুরনো ফ্রেমওয়ার্কের বৃত্তেই আটকে আছে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

আমাদের হাই-টেক পার্ক আর ডেটাসেন্টারগুলো প্রাথমিক অবকাঠামো হিসেবে ভালো শুরু হলেও, উচ্চ-লেভেলের কম্পিউটেশন, এআই মডেল ট্রেইনিং কিংবা কোয়ান্টাম-রেডি ডাটা প্রসেসিং হোস্ট করার জন্য আমাদের যে ধরনের ভৌত সক্ষমতা দরকার, সেখানে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইটি হাবের জন্য প্রয়োজন মেগাওয়াট স্কেলের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ গ্রিড এবং আল্ট্রা-লো ল্যাটেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি। বিদ্যুৎ সরবরাহ আর কানেক্টিভিটির অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বড় টেক জায়ান্টরা তাদের রিজিওনাল হাব স্থাপনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে না নিয়ে সিঙ্গাপুর বা ভারতের দিকে চলে যাচ্ছে।

একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি ডিসকানেক্ট

একটি দেশের প্রযুক্তির আসল মেরুদণ্ড তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে আইটি ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি কোনো আত্মিক যোগাযোগ নেই। বিশ্বের সেরা ল্যাবগুলো যেখানে লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, মাল্টিভ্যারিয়েবল ক্যালকুলাস এবং হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচারের ওপর জোর দিচ্ছে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস এখনো এক দশক পুরোনো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ আর থিওরিটিক্যাল ডাটাবেজের ডাস্টবিনে আটকে আছে।

‘ইনোভেশন ইকোনমি’র পথে উত্তরণের কৌশলগত ক্ষেত্রসমূহ

বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার চাকা যখন সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং শক্তির সংজ্ঞা পারমাণবিক বোমা থেকে কিউবিট ক্যাপাসিটিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রথাগত আইটি সেবার বৃত্তে বন্দি থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে সস্তা শ্রমের ‘আউটসোর্সিং ডেস্টিনেশন’ থেকে নিজেদের উন্নীত করে একটি ‘কোয়ান্টাম ও ইনোভেশন ইকোনমি’ তৈরি করা।
১. ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) এবং ফিনটেক বিপ্লব: আমাদের ফিনটেক ইকোসিস্টেমকে এশিয়ার অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। এটি করা সম্ভব হলে রেমিট্যান্স আসার খরচ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি এশিয়ার বাজারে তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে পারবেন। একই সাথে, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নাগরিক ডাটাবেজকে সুরক্ষিত ওপেন এপিআই ভিত্তিক সেন্ট্রাল ডাটা এক্সচেঞ্জ আর্কিটেকচারে রূপান্তর করতে হবে।
২. এগ্রি-টেক এবং ফুড সিকিউরিটি অপ্টিমাইজেশন: বাজার সিন্ডিকেট এবং লজিস্টিকস অপচয় দূর করতে আইওটি (IoT) এবং ডাটা-ড্রিভেন সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি। কোল্ড স্টোরেজগুলোর তাপমাত্রা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা এবং দেশের কোন অঞ্চলে কোন ফসলের কেমন চাহিদা রয়েছে, তা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে কৃষকদের আগে থেকে জানাতে পারলে ফসলের অপচয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
৩. ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেমিকন্ডাক্টরের প্রান্তিক ইকোসিস্টেম: তাইওয়ান বা ভিয়েতনামের মতো এখনই চিপ উৎপাদন কারখানা তৈরি করা সম্ভব না হলেও, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC) ডিজাইন বা চিপের নকশা তৈরি করার ক্ষেত্রে আমরা এগোতে পারি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের দেশের মেধা তৈরি করার ল্যাবগুলোকে চিপ ডিজাইন সফটওয়্যারের লাইসেন্স এবং হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং সাপোর্ট দিলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম বড় ‘চিপ ডিজাইন ও ভিএলএসআই আউটসোর্সিং’ হাবে পরিণত হতে পারে।
৪. স্মার্ট গভর্ন্যান্স ও জুডিশিয়াল ম্যানেজমেন্ট: আদালতগুলোতে ঝুলে থাকা লাখ লাখ মামলার ফাইল ও রায়গুলোকে ডিজিটাল ডাটাবেজে রূপান্তর করে একটি ডাইনামিক ক্যাটাগরি তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মামলার সমন জারি এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় করা হলে বিচারকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমে যাবে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে।

নীতিনির্ধারণী দেয়াল ও ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের ঝুঁকি

বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার চাকা যখন সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ার দিকে ঘুরছে, তখন বাংলাদেশ যদি কেবল উদাসীন দর্শক হয়ে থাকে, তবে আমরা একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন ধরনের পরাধীনতা বা ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের’ শিকার হব। এই নতুন কলোনিয়ালিজমে কোনো দেশ জমি দখল করে না, বরং তারা একটি দেশের সম্পূর্ণ ডেটা, পেমেন্ট ইকোসিস্টেম এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, প্রযুক্তির গতি জ্যামিতিক হারে বাড়লেও আমাদের আমলাতান্ত্রিক পলিসির গতি অত্যন্ত ধীর। একজন আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট যখন বাংলাদেশে স্টার্টআপ বা ডিপ-টেক খাতে বিনিয়োগ করতে চান, তখন তাকে টাকা দেশে আনা এবং লভ্যাংশ ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিল ব্যাংকিং নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। একই সাথে, এশিয়ার দেশগুলো যখন কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর এক বিশাল অদৃশ্য সাইবার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ বা কোয়ান্টাম-সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার তৈরি করার প্রস্তুতি শুরু না করে, তবে আগামী এক দশকে আমাদের সমগ্র ফিন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম এক চরম সার্বভৌমত্ব সংকটের মুখোমুখি হবে।

আগামী ১০ বছরের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস

১. এআই এজেন্টের একাধিপত্য (২০২৮): আগামী ৩ বছরের মধ্যে প্রথাগত ডেটা এন্ট্রি এবং সাধারণ ডেভেলপমেন্টের কাজগুলো সম্পূর্ণভাবে এআই এজেন্টরা দখল করে নেবে। যারা দ্রুত ক্লাউড ডেটা আর্কিটেকচার এবং এআই মডেল ফাইন-টিউনিংয়ের মতো উচ্চ-দক্ষতার কাজে নিজেদের রূপান্তর করতে পারবে না, তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ছিটকে যাবে।
২. এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর মনোপলি (২০৩০): বৈশ্বিক কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশ এককভাবে এশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। সিলিকন ভ্যালি ডিজাইন হাব হিসেবে থাকলেও মূল উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে এশীয় অক্ষের হাতে।
৩. বাংলাদেশের নিজস্ব লার্জ ফাউন্ডেশনাল মডেল (২০৩১): নিজস্ব ডেটা সোভারেনটি রক্ষার তাগিদে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নিজস্ব বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি লার্জ ফাউন্ডেশনাল মডেল তৈরি করতে বাধ্য হবে, যা সরকারি সেবা ও শিক্ষা খাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
৪. কোয়ান্টাম ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের উত্থান (২০৩৩): বিশ্বজুড়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কমার্শিয়াল ক্লাউড সার্ভিসে রূপ নেবে এবং বাংলাদেশের ফিনটেক সেক্টর লজিস্টিকস অপ্টিমাইজেশনের জন্য এই কোয়ান্টাম ক্লাউড সাবক্রিপশন ব্যবহার করা শুরু করবে।
৫. আইপি-ভিত্তিক নতুন স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম (২০৩৬): বাংলাদেশের আইটি খাতের মূল রাজস্ব আর ঘণ্টা চুক্তির সস্তা শ্রম থেকে আসবে না; তা আসবে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা আইপি এবং সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস মডেল থেকে।

আমাদের পরবর্তী ১০ বছরের রোডম্যাপ

সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ার দিকে বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের এই নতুন সমীকরণটি বাংলাদেশের জন্য একই সাথে একটি চরম সতর্কবার্তা এবং এক ঐতিহাসিক সুযোগ। এশিয়ার এই নতুন প্রযুক্তিগত পরাশক্তিদের সাথে কাঁধ মেলাতে হলে এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশকে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে মাঠে নামতে হবে:
১. ‘সার্ভিস মডেল’ থেকে ‘আইপি-ড্রিভেন ইনোভেশন’ মডেলে রূপান্তর: আমাদের জাতীয় আইটি পলিসিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে দেশীয় আইটি কোম্পানিগুলো নিজস্ব কাস্টমাইজড সফটওয়্যার ও ইউনিক ফিনটেক সলিউশন তৈরি করতে পারে। এর জন্য বিশেষ ট্যাক্স ইনসেন্টিভ এবং আন্তর্জাতিক পেটেন্ট ফাইলিং ফান্ড গঠন করতে হবে।
২. উচ্চতর গণিত ও চিপ ডিজাইনে মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার সায়েন্স পাঠ্যসূচি থেকে পুরনো সিলেবাস হটিয়ে লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ভিএলএসআই ডিজাইন কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় মেধাগুলোকে গবেষক ও আর্কিটেক্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
৩. পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি ও ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষা: কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রতিরক্ষা খাত এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো সংবেদনশীল ডেটা পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত করতে একটি ‘জাতীয় কোয়ান্টাম নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে। দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ এনক্রিপশন প্রোটোকলকে কোয়ান্টাম-সুরক্ষিত স্ট্যান্ডার্ডে আপগ্রেড করতে হবে।
৪. আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক রেগুলেশনের আধুনিকীকরণ: বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আকর্ষণ করার জন্য আমাদের ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট রেগুলেশন এবং ব্যাংকিং নীতি সহজ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের মতোই সহজে বাংলাদেশে পুঁজি নিয়ে আসতে পারেন।
আমরা একটি দেশের প্রযুক্তিগত যাত্রার এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অতীতের সফলতা আগামী দিনের টিকে থাকার গ্যারান্টি দেয় না। সিলিকন ভ্যালির একাধিপত্যের পতন এবং এশিয়ার এই নতুন উত্থান আমাদের সামনে যে জানালাটি খুলে দিয়েছে, তা চিরকাল খোলা থাকবে না। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি সস্তা শ্রমের ফ্রিল্যান্সিং মডেলের আত্মতুষ্টিতে মগ্ন থেকে নতুন যুগের ডিজিটাল কলোনিতে পরিণত হব? নাকি দূরদর্শী পলিসি, গভীর গাণিতিক মেধা এবং নিজস্ব উদ্ভাবন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এশিয়ার এই নতুন টেক-ইকুয়েশনের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করব? সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের এই রূপান্তরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক: সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

তথ্য প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক কর্মী
Tags :

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।