খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে আষাঢ় ১৪৩২ | ১৬ই জুন ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যবই ছাপাতে গিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের কাগজ ও ছাপার মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাত করেছে কিছু অসাধু প্রেস মালিকদের চক্র। বই বিতরণের পাঁচ মাস না পেরোতেই অনেক অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা বই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, যা বছরজুড়ে ব্যবহারের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যেই ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপাতে ফের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এবার বাজেট ১,৬০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার জন্য প্রকাশিত দরপত্রে মেশিনের আকার নির্ধারণ করে শর্ত দেওয়া হলেও পরে তা সংশোধন করে এমন মেশিনের আকার নির্ধারণ করা হয় যাতে মানসম্পন্ন বই তৈরি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ পেতে বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করে এনসিটিবি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে। এনসিটিবি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতামত নিয়ে মেশিনের মাপ সংশোধন করে।
এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবু নাসের টুকু বলেন, ‘প্রথমে সঠিক মাপ দিয়েই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সংশোধন আনতে হয়েছে যাতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারে।’
বিশেষভাবে আলোচিত আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানি জব্বার, যিনি একটি সরকারের মন্ত্রীর ভাই এবং একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি এবারও বই ছাপার বড় কাজ পেয়েছেন। তাঁর প্রেস থেকে ছাপা নিম্নমানের ২০ হাজার বই আগেই বাতিল করেছে এনসিটিবি। তবুও তিনিই এখনো কাজ পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
এনসিটিবি ৩২টি টিমকে ৬৪ জেলায় পাঠিয়ে পাঠ্যবইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে। দেখা গেছে, ৪০ কোটি বইয়ের মধ্যে অন্তত ১৩ কোটি বই মানহীন। এসব বইয়ের কাগজের জিএসএম (ঘনত্ব), উজ্জ্বলতা ও বাঁধাই—সব কিছুতেই ত্রুটি রয়েছে।
বই ছাপার মান যাচাইয়ে দায়িত্বে থাকা ‘হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’-এর রিপোর্ট বলছে, লেটার এন কালার লিমিটেড ৮০ জিএসএমের জায়গায় ৬৯-৭০ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করেছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও অনুপম প্রিন্টার্স, অক্সফোর্ড প্রেস, দ্য গুডলাক—সবাই নির্ধারিত মানের নিচে কাগজ ব্যবহার করেছে।
প্রকাশকদের কেউ কেউ স্বীকার করেছে বইয়ে ভুল হয়েছে। লেটার এন কালার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শেখ সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘ভুল হয়ে থাকলে বই রিপ্লেস করছি।’
হাই-টেকের রিপোর্ট অনুযায়ী, নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের তালিকায় রয়েছে আরও কয়েকটি প্রেস, যেমন শাফিন, সুবর্ণা, অ্যারিস্টোক্র্যাটস, বর্ণমালা, ন্যাশনাল, দোয়েল ও রেদওয়ানিয়া প্রেস। এরা ৫৫ থেকে ৬৫ জিএসএমের মধ্যে কাগজ ব্যবহার করেছে, যেখানে দরপত্রে ৭০-৮০ জিএসএম নির্ধারিত ছিল।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, ‘১৬টি প্রতিষ্ঠানকে নিম্নমানের বই রিপ্লেস করতে বলা হয়েছে, না করলে তাদের জমাকৃত অর্থের ২০ শতাংশ কেটে নেওয়া হবে।’
২০২৬ সালের বই ছাপার দরপত্রে মেশিনের মাপ সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে সঠিক মাপেই দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। পরে ১১৬টি প্রেস চিঠি দিয়ে সংশোধনের অনুরোধ করে। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশোধন করা হয়। তবে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বই সরবরাহ করতেই হবে।’
খবরওয়ালা/এমএজেড