খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ে নতুন অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে—নির্বাচিত সরকার গঠনের আগে এই কিস্তি ছাড় হবে না।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে, সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশ্বাস নিয়েই অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফ। ষষ্ঠ কিস্তি হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় ৮০ কোটি ডলারের কিছু বেশি পাওয়ার কথা।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বার্ষিক সভার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেই সংস্থাটি এই অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
বৈঠকে গভর্নর জানান, চলমান সংস্কারমূলক শর্তগুলো পূরণ করা হলে ডিসেম্বরে, অর্থাৎ নির্বাচনের আগেই, ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় হওয়া উচিত। কিন্তু আইএমএফ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসছে; তাই সংস্কার ও ঋণের শর্ত নিয়ে তাদের অবস্থান জানা জরুরি। সংস্থাটি নতুন সরকারের কাছ থেকে সংস্কার অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার নিয়েই কিস্তি ছাড় করতে চায়।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর পরে গণমাধ্যমকে বলেন, আইএমএফ-এর এই অর্থ এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যাবশ্যক নয়। রিজার্ভ পরিস্থিতি ভালো, ডলারের সরবরাহ স্থিতিশীল। তবে আইএমএফ-এর নীতিগত সহায়তা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সহযোগিতা অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় রাখে।
তিনি আরও জানান, আইএমএফ-এর ঋণ কর্মসূচির আওতায় সব সময় থাকা বাধ্যতামূলক নয়; দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটাই পরিবর্তিত।
অন্যদিকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইএমএফ যদি আগামীতে ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত দেয়, বাংলাদেশ তা গ্রহণ করবে না। তার মতে, দেশ এখন এমন অবস্থায় নেই যে কঠিন শর্ত মেনে চলতে হবে; অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফ সাধারণত নানা কৌশলে নিজেদের শর্ত বাস্তবায়ন করাতে চায়। আসন্ন নির্বাচনকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে দেখছে। নির্বাচনের আগে কিস্তি স্থগিত রাখলে বর্তমান সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও ভাবমূর্তিগত চাপ বাড়বে, আর নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছ থেকে কঠোর সংস্কার প্রতিশ্রুতি আদায় করা সহজ হবে।
ইতিহাসও এমন উদাহরণ রাখে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রিজার্ভ নেমে গিয়েছিল ১০০ কোটি ডলারের নিচে, ফলে আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) বকেয়া পরিশোধেও সমস্যা হয়। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আইএমএফ-এর সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তি করে। আবার ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময় আইএমএফ ঋণ চাইলে সংস্থাটি আগেই জ্বালানি ও মুদ্রানীতিতে কঠোর শর্ত আরোপ করে, যার প্রভাবে জ্বালানি ও সারসহ নানা খাতে দামের ঊর্ধ্বগতি ও টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে—যা এখনো মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে, আইএমএফ-এর একটি মূল্যায়ন মিশন ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসছে। তারা দুই সপ্তাহ অবস্থান করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে এবং পরবর্তীতে ওয়াশিংটনে মূল কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আইএমএফ-এর অর্থ ছাড় না হলেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতিতে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। বর্তমানে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় উভয়ই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে আছে, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে, এবং রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২১৪ কোটি ডলারে।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা সামাল দিতে ২০২২ সালের শেষে আইএমএফ-এর কাছে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চায় বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেই ঋণ অনুমোদন হয়, পরে তা বাড়িয়ে মোট ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তি এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নতুন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড