ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় আংশিক পরিবর্তন করেছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটির জন্য তৎকালীন বিচারিক আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কমিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর এ রায় ঘোষণা করেন। প্রায় সাত বছর আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক আদালতের রায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল। শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট রায় ঘোষণার জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়।
হাইকোর্টের রায়ে তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা এবং তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও ১০ আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার বিচারিক আদালতের রায় নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আদালত মনে করেছেন, ১৬ আসামির বিরুদ্ধে একইভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। একসঙ্গে এতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিকে আদালত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা সীমিত করার নির্দেশ দেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তাকে সংযুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নুসরাত জাহান রাফি ছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে নুসরাতের মা মামলা করেন। অভিযোগের পর সিরাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত ও বিচারিক নথি অনুযায়ী, অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এরপর ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ফেনী ও ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নুসরাতের মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচারিক আদালতে ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করা হয়। ওই রায়ে মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল।
বিচারিক আদালতের সেই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি দণ্ডিত আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই হাইকোর্টে এসব আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয়। ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে ২০ আগস্ট রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
হাইকোর্টের আজকের রায়ে তাই শুধু নুসরাত হত্যা মামলার দণ্ডের প্রশ্নই নিষ্পত্তি হয়নি; একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে। একদিকে নুসরাত হত্যার ঘটনায় দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রয়েছে, অন্যদিকে প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া বিবেচনায় অন্য আসামিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কিংবা খালাসের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ফলে সাত বছর আগের বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক ইতিহাসে আজকের রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো।



