পদ্মা চরের কাকন বাহিনীর আতঙ্কে ছয় মাসে সাত মৃত্যু ঘটনা
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুন ২০২৬, ৯:৫৯ এএম
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মা চরের বিস্তৃত বালুমহাল, নদীপথ ও কৃষিজমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখল ও আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত চলমান রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও আলোচিত নাম হয়ে উঠেছে ‘কাকন বাহিনী’। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতার কারণে পুরো চরাঞ্চল কার্যত এক ধরনের আতঙ্কের অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গত নয় মাসে ধারাবাহিক সহিংসতা, গুলিবর্ষণ ও দখলদারিত্বের ঘটনায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভোরে লালপুরের রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ ধরার সময় জেলেদের লক্ষ্য করে তীরবর্তী এলাকা থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে সাহাবুল ইসলাম নামের এক জেলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা দ্রুতগতির নৌযানে এসে নদীপথকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়, ফলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
এর আগে ৯ জুন চরজাজিরা এলাকায় নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় গুলিবিদ্ধ এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তে জানা যায়, সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মরদেহটি পরে ভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী বিশাল চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তবে ‘কাকন বাহিনী’কে সবচেয়ে সংগঠিত ও ভয়ংকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বাহিনী প্রায় শতাধিক সশস্ত্র সদস্য নিয়ে বালুমহাল, ঘাট ও নদীপথ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল, জেলেদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অস্ত্র প্রদর্শনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, কোনো ঘাট বা বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হলে তারা নৌযান ব্যবহার করে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে এবং গুলিবর্ষণ করে থাকে। এতে সাধারণ কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার কারণে চাষাবাদ বা মাছ ধরার কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
নিম্নে সাম্প্রতিক কিছু সহিংস ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো—
তারিখ
স্থান
ঘটনা
হতাহত
১৬ জুন
রাইটার চর
নদীতে জেলেদের ওপর গুলিবর্ষণ
১ জন নিহত
৯ জুন
চরজাজিরা
গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার
১ জন নিহত
মে মাসের বিভিন্ন সময়
সীমান্ত চরাঞ্চল
সশস্ত্র সংঘর্ষ ও দখলদারিত্ব
একাধিক নিহত
এদিকে সংসদীয় অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য চরাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বালুমহাল ও নদীপথ কেন্দ্রিক সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নাটোর জেলা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে এবং নৌপুলিশসহ বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের কারণে নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া পদ্মা চরের এই সহিংসতার চক্র থামানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মন্তব্য