খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে মাঘ ১৪৩২ | ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার তাদের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাওয়া ‘আনসাং হিরো’ বা আড়ালের নায়কদের এই তালিকায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মোট ৪৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁদের অনন্য অবদানের জন্য এই সম্মাননায় ভূষিত করা হচ্ছে, যাঁদের জীবনকাহিনি সাধারণ মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
এবারের তালিকার অন্যতম চমক হলেন কর্ণাটক রাজ্যের মহিশূর জেলার ৭৫ বছর বয়সী আঙ্কে গৌড়া। একসময় বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করা এই সাধারণ মানুষটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্মুক্ত গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘পুস্তক মানে’ (বইয়ের বাড়ি) নামক গ্রন্থাগারে ২০টি ভিন্ন ভাষায় প্রায় ২০ লাখের বেশি বই এবং অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি রয়েছে। জ্ঞানকে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়ার এই অসামান্য প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে।
কয়েকজন বিশিষ্ট পদ্মশ্রী জয়ী ও তাঁদের অবদানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
| ব্যক্তিত্বের নাম | রাজ্য | অবদানের ক্ষেত্র ও বিশেষত্ব |
| আঙ্কে গৌড়া | কর্ণাটক | ২০ লাখ বইয়ের বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা। |
| ডা. আরমিদা ফার্নান্দেস | মহারাষ্ট্র | এশিয়ার প্রথম মানব দুধের ব্যাংক (Human Milk Bank) স্থাপন। |
| ভিকলিয়া লাদকিয়া ধিন্ডা | মহারাষ্ট্র | বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র ‘তার্পা’র ঐতিহ্য রক্ষা। |
| অন্যান্য ৪৫ জন | সমগ্র ভারত | জনসেবা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ। |
মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিশু চিকিৎসক ডা. আরমিদা ফার্নান্দেস এ বছরের তালিকায় এক বিশেষ উজ্জ্বল নাম। তিনি এশিয়ার প্রথম মানব দুধের ব্যাংক (Human Milk Bank) প্রতিষ্ঠা করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। যে সকল নবজাতক শিশু মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে থাকত, তাঁর এই উদ্যোগের ফলে সে সকল শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক দশক ধরে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় তাঁর এই নিরলস লড়াই পদ্মশ্রী সম্মাননার মাধ্যমে পূর্ণতা পেল।
৯০ বছর বয়সী আদিবাসী শিল্পী ভিকলিয়া লাদকিয়া ধিন্ডা মহারাষ্ট্রের এক নিভৃত গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন। তিনি বিরল বাদ্যযন্ত্র ‘তার্পা’ বাজানোয় সিদ্ধহস্ত। লাউ এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কিন্তু এই বৃদ্ধ শিল্পী তাঁর বয়সের ভার উপেক্ষা করে এই লোকসংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ধরে রেখেছেন। ভারতের লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাঁর এই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ‘পদ্মশ্রী’ হলো ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। এর ওপরের ধাপগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ। আর দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা হলো ‘ভারতরত্ন’। প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে সরকারের পক্ষ থেকে এই নামগুলো ঘোষণা করা হয়, যা কেবল সম্মাননা নয়, বরং জাতির পক্ষ থেকে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
ভারতের এবারের পদ্মশ্রী তালিকাটি আবারও প্রমাণ করল যে, স্বীকৃতি কেবল রাজপ্রাসাদ বা মহানগরীর অভিজাত আঙিনায় সীমাবদ্ধ নয়। মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের মঙ্গলে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের শ্রম ও ত্যাগ রাষ্ট্রের নজরে আসে। আঙ্কে গৌড়া বা আরমিদা ফার্নান্দেসদের মতো মানুষদের সম্মানিত করার মাধ্যমে আসলে ভারত তার প্রকৃত আত্মাকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরল।