খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
একবিংশ শতাব্দীতে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) কেবল একটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক আধিপত্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক। বর্তমানে চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান প্রযুক্তিগত দ্বৈরথ একটি নতুন ধরনের ‘শীতল যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর বা উন্নত চিপ উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা অবরোধ মোকাবিলায় চীন একটি অত্যন্ত উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও গোপনীয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টাকে বিশেষজ্ঞরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্পের সাথে তুলনা করে ‘চীনা ম্যানহাটন প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
চিপ উৎপাদনের সবচেয়ে জটিল ও অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হলো ‘এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট’ (EUV) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলিকন ওয়েফারের ওপর মানুষের চুলের চেয়েও হাজার গুণ পাতলা সার্কিট খোদাই করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এএসএমএল’ (ASML) এই প্রযুক্তির একক মালিক। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সাল থেকে নেদারল্যান্ডস ও জাপানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে চীনের কাছে এই উন্নত যন্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রযুক্তিগত অবরোধের মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের এআই উন্নয়ন ও উন্নত সামরিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরির পথ রুদ্ধ করা। তবে বেইজিং এই চ্যালেঞ্জকে কেবল রুখতেই নয়, বরং নিজেরা স্বনির্ভর হতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
চীনের এই গোপন প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে এবং এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে রয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা। রয়টার্সের তথ্যমতে, শেনঝেনের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা গবেষণাগারে চীনা বিজ্ঞানীরা লিথোগ্রাফির জন্য প্রয়োজনীয় আলোর উৎস তৈরিতে প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন। যদিও এই যন্ত্রটি এএসএমএলের তুলনায় আকারে বিশাল এবং কারিগরিভাবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, তবুও এটি পশ্চিমা বিশ্বের সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে যে, চীন এই প্রযুক্তি কখনোই আয়ত্ত করতে পারবে না।
ইইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির জটিলতা এবং এই প্রতিযোগিতার বর্তমান চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | এএসএমএল (নেদারল্যান্ডস/পশ্চিম) | চীনের গোপন প্রকল্প (হুয়াওয়ে/রাষ্ট্রীয়) |
|---|---|---|
| প্রযুক্তির নাম | ইইউভি (EUV) লিথোগ্রাফি | চীনা সংস্করণ (পরীক্ষামূলক পর্যায়) |
| যন্ত্রের ওজন ও মূল্য | ১৮০ টন; প্রায় ২৫ কোটি ডলার | অনির্ধারিত (বিশাল বিনিয়োগ) |
| উৎপাদন সক্ষমতা | ৫ ন্যানোমিটার বা তার নিচে | বর্তমানে ৭ ন্যানোমিটার (লক্ষ্য ২০২৮-৩০) |
| প্রধান বাধা | কার্ল জাইস (জার্মানি)-এর অপটিক্যাল লেন্স | লেন্স ও লেজার সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা |
| কৌশলগত অবস্থান | বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ | রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেধাসম্পদ সংগ্রহ |
প্রযুক্তিগত এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে চীন ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চলের কৌশল অবলম্বন করছে। তারা এএসএমএলের সাবেক প্রকৌশলীদের বিশাল অঙ্কের বেতনের বিনিময়ে নিয়োগ দিচ্ছে, যাদের বার্ষিক বেতন ৪ থেকে ৭ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত। নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রকৌশলীদের পরিচয় ও কর্মস্থলের নাম গোপন রাখা হচ্ছে। এছাড়া সরাসরি নতুন যন্ত্র কিনতে না পেরে চীন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরোনো যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একদল মেধাবী তরুণ এসব পুরোনো যন্ত্র খুলে প্রতিটি অংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে এবং পুনরায় জোড়া লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, যার পুরো প্রক্রিয়া ভিডিও করে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে চীনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জার্মান প্রতিষ্ঠান ‘কার্ল জাইস’-এর তৈরি অতিনির্ভুল আয়না ও অপটিক্যাল সিস্টেমের বিকল্প তৈরি করা। প্রতি সেকেন্ডে ৫০ হাজার বার গলিত টিনে লেজার চালনা করে যে প্লাজমা তৈরি করতে হয়, তার জন্য অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে এআই চিপ উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে। এই লক্ষ্যে সফল হলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা চীনের জন্য সম্ভব হবে। এর ফলে কেবল স্মার্টফোন বা কম্পিউটার বাজার নয়, বরং ভবিষ্যতের এআই চালিত যুদ্ধবিমান, মিসাইল সিস্টেম এবং অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্যও আমূল বদলে যেতে পারে।