খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে মাঘ ১৪৩২ | ১৫ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক যুগান্তকারী ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অর্জিত মুনাফা বাতিল বা ‘হেয়ারকাট’ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি অনুসরণ করে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের ফলে আমানতকারীরা গত দুই বছরে তাদের জমানো টাকার ওপর কোনো লভ্যাংশ পাবেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে আমানতের মূল স্থিতিও কমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আজ বুধবার সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক পত্রে এই নির্দেশনা নিশ্চিত করেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন শক্তিশালী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এই রেজোল্যুশন স্কিমের অংশ হিসেবেই আমানতকারীদের ওপর এই আর্থিক বোঝা চাপানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক অবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিবরণ | তথ্য/পরিসংখ্যান |
| একীভূত হওয়া ব্যাংকের সংখ্যা | ৫টি |
| প্রস্তাবিত নতুন নাম | সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক |
| মোট আমানতকারী | প্রায় ৭৫ লক্ষ |
| মোট আমানতের পরিমাণ | ১ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকা |
| মোট ঋণের পরিমাণ | ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকা |
| হেয়ারকাট সময়কাল | ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ |
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পাঁচটি ব্যাংক গত দুই বছরে বিশাল অংকের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফায় রাখা আমানত থাকলেও, কুঋণ বা খেলাপি ঋণের আধিক্য থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা দেওয়ার সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সব আমানত হিসাবের স্থিতি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের অবস্থানের ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আমানতকারীরা কেবল তাদের দুই বছরের লভ্যাংশই হারাবেন না, বরং মূল আমানতের একটি অংশও কেটে রাখা হতে পারে। বিশ্বজুড়ে দেউলিয়া বা সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত করার ক্ষেত্রে ‘হেয়ারকাট’ একটি পরিচিত কৌশল হলেও বাংলাদেশে এটি বড় ধরণের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আলোচিত এই পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বিএবি-র সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব ব্যাংক থেকে বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। ইতিপূর্বে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে উদ্যোক্তা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ হারিয়েছেন। এখন ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়ভার সাধারণ আমানতকারীদের কাঁধেও এসে পড়ল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে নতুন গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ একটি স্বচ্ছ ব্যালেন্স শিট নিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারবে। এটি আমানতকারীদের স্বার্থ দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করবে বলে কর্মকর্তাদের দাবি। আমানতকারীদের আমানত হিসাব পুনরায় গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। তবে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের ফলে এক ধরণের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।