যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবটি সোমবার (৬ এপ্রিল) থেকেই কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সূত্র অনুযায়ী, পাকিস্তান দ্রুততার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের কাছে একটি দুই ধাপের শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। প্রথম ধাপে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে, আর দ্বিতীয় ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক সমঝোতাটি একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আকারে ইলেকট্রনিকভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান একমাত্র যোগাযোগ চ্যানেল হিসেবে কাজ করছে।
এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ৪৫ দিনের একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা ধাপে ধাপে একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র আরও জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এর মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে একটি বিস্তৃত চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তির নাম দেওয়া হতে পারে “ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড”, যার আওতায় প্রণালিকে ঘিরে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। চূড়ান্ত আলোচনাটি সরাসরি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্রও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারা পূর্বে জানিয়েছেন, তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক হামলা চালাবে না—এমন নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছেন, বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশ যেমন পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশর ইতোমধ্যে তাদের কাছে বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
সূত্রের আরও দাবি, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত বা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এর বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
তবে পাকিস্তানের ভেতরের দুটি পৃথক সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। যদিও কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং আলোচনার গতি বাড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়, ফলে সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে পুরো পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ এখন মূলত তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের কাঠামো (সংক্ষিপ্ত সারাংশ)
| ধাপ |
বিষয় |
বিবরণ |
| প্রথম ধাপ |
তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি |
সামরিক সংঘাত বন্ধ ও উত্তেজনা প্রশমন |
| দ্বিতীয় ধাপ |
স্থায়ী চুক্তি |
১৫–২০ দিনের মধ্যে বিস্তৃত সমঝোতা |
| মধ্যস্থতাকারী |
পাকিস্তান |
একমাত্র যোগাযোগ চ্যানেল হিসেবে ভূমিকা |
| সম্ভাব্য চুক্তি |
ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড |
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠন |
| মূল ফোকাস |
হরমুজ প্রণালি |
নৌচলাচল ও জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিককরণ |