খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৬ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বগুড়ার চকফরিদ এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি শাহ সুলতান কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তরুণ প্রভাষক ফাবিয়া তাসনিম সিধির (২৯) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি স্থানীয় সমাজে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করার পর থেকে পরিবার, সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানান প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এটি কি আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে নিহতের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। তবে তিনি জানান, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ফাবিয়া তাসনিম সিধি ৪১তম বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে প্রায় দেড় বছর আগে বগুড়ার সরকারি শাহ সুলতান কলেজে যোগ দেন। ময়মনসিংহের একটি শিক্ষিত পরিবারের মেধাবী সন্তান ছিলেন তিনি। তার সহকর্মীদের ভাষ্য মতে, তিনি শান্ত-স্বভাবের এবং পড়াশোনা ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন।
সহকর্মীরা জানান, কলেজে তিনি প্রাণিবিদ্যার এক উদ্যমী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরিবার থেকে দূরে থেকেও কলেজ ও বাসা—এই দুই জায়গায় তার সময় কাটতো বেশ গুছিয়েই। কোনো ধরনের সামাজিক বা পারিবারিক বিরোধের কথাও সহকর্মীরা স্মরণ করতে পারেননি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ফাবিয়া বগুড়া শহরের চকফরিদ এলাকার ডা. রাশেদুল হাসানের বাড়ির তৃতীয় তলায় মায়ের সঙ্গে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। কয়েক দিন আগে তার মা গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে গেলে তিনি একাই বাসায় ছিলেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে মেয়েকে ফোনে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তার মা। রাত ১০টার দিকে বগুড়ায় এসে দরজা নক করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় থানায় খবর দেন। এরপর পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে শৌচাগার থেকে ফাবিয়ার নিথর দেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—
তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল,
মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে,
যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, মরদেহ রাত সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হলেও তদন্তে তারা হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, ফোনের কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে।”
চকফরিদ এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ফাবিয়া সাধারণত আত্মমুখী জীবনযাপন করতেন। আশেপাশের মানুষের সঙ্গে কম মিশলেও কোনো বিরোধ বা ঝামেলার খবর কখনও শোনা যায়নি। তারা মনে করছেন, তার মৃত্যু রহস্যজনক এবং এর পেছনে কোনো ‘অস্বাভাবিক’ কারণ থাকতে পারে।
নিহতের মা প্রাথমিকভাবে কোনো অভিযোগ না করলেও তিনি মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা জানিয়েছেন, ফাবিয়া মানসিকভাবে খুব দৃঢ় ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। তাই হঠাৎ মৃত্যুকে কোনোভাবেই তারা ‘স্বাভাবিক’ মনে করছেন না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তরুণী শিক্ষকের এই মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে একা থাকা নারীদের নিরাপত্তা, কর্মজীবী নারীদের বাসস্থানের ঝুঁকি এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মেধাবী প্রভাষক ফাবিয়া তাসনিমের সময়ের আগেই চলে যাওয়া তার পরিবার, শিক্ষাঙ্গন ও সমাজের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। তার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের অগ্রগতি—এই দুটিই এখন নির্ধারণ করবে এটি কোনো দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড।