খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পরও ঘরোয়া ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ আসর ফেডারেশন কাপের ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যু নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান ঘটেনি। ফাইনালে উত্তীর্ণ দুই দল—মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও বসুন্ধরা কিংসের মধ্যকার এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ (মঙ্গলবার) বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তাদের আগের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় ম্যাচটি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ক্লাবটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই বসুন্ধরা কিংসের হোম গ্রাউন্ডে ফাইনাল ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবে না।
এই অচলাবস্থা নিরসনে বাফুফে ভবনে মোহামেডানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক করেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। বৈঠকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন দলটির পরিচালক (ক্রীড়া) মোস্তাকুর রহমান। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও ভেন্যু সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাফুফে সভাপতির সাথে বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন মোহামেডানের ক্রীড়া পরিচালক মোস্তাকুর রহমান। তিনি ক্লাবের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন,
“আমি ক্লাবের পক্ষ থেকে বাফুফে সভাপতিকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি যে, কিংস অ্যারেনায় আমাদের পক্ষে ফাইনাল খেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা এর বিকল্প হিসেবে যেকোনো নিরপেক্ষ ভেন্যু নির্ধারণ করার জন্য বাফুফেকে অনুরোধ জানিয়েছি। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ বাফুফে কী নেবে, তা সম্পূর্ণ তাদের বিষয়।”
মোস্তাকুর রহমান আরও উল্লেখ করেন যে, অতীতে কিংস অ্যারেনায় খেলতে গিয়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব যেসব প্রতিকূলতা ও বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ বাফুফে সভাপতিকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ ও দাবির প্রেক্ষিতে বাফুফে সভাপতি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। তিনি সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে মোহামেডান কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেছেন।
মোহামেডানের সাথে বৈঠকের পর বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তাদের আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে এবং তারা কিংস অ্যারেনায় খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সভাপতি আরও জানান, ভেন্যু নিয়ে কেবল মোহামেডানেরই নয়, বরং দুই দলেরই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মোহামেডানের হোম ভেন্যু কুমিল্লা নিয়ে বসুন্ধরা কিংসেরও আপত্তি ও অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাফুফে সভাপতির তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল ফেডারেশন কাপের ড্র অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে ভেন্যু সংক্রান্ত বিষয়াদি নির্ধারিত হয়। তবে এই বক্তব্যের ভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন মোহামেডানের ফুটবল ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ নকিব। তাঁর দাবি, ড্র অনুষ্ঠানের প্রথম দিনই মোহামেডানের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছিল। নকিব বলেন,
“আমরা ড্রয়ের অনুষ্ঠানেই পরিষ্কার বলেছিলাম, ফাইনালে যদি মোহামেডান এবং বসুন্ধরা কিংস ওঠে, তবে আমরা কিংসের মাঠে ফাইনাল খেলব না। প্রতিপক্ষ যদি আবাহনী লিমিটেড হতো, তবে কিংসের মাঠে খেলতে আমাদের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু কিংসের বিপক্ষে তাদেরই মাঠে ফাইনাল খেলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
গত ১২ মে কুমিল্লা ভেন্যুতে ব্রাদার্স ইউনিয়নকে পরাজিত করে প্রথম দল হিসেবে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে উত্তীর্ণ হয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। মোহামেডান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ম্যাচ শেষ করে খেলোয়াড়রা যখন মাঠ থেকে বেরও হননি, ঠিক তখনই লিগ কমিটির পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনের খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানানো হয় যে ফাইনাল ম্যাচটি কিংস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত হবে। মোহামেডান আগে থেকেই আপত্তি জানানো সত্ত্বেও বাফুফে কেন তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠাল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইমতিয়াজ আহমেদ নকিব।
বিষয়টি আরও গুরুতর রূপ নেয় যখন মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন জানান যে, ক্লাবের সভাপতি ও সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু নিজে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে ফোন করে কিংসের মাঠে না খেলার সিদ্ধান্ত এবং এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণসমূহ ব্যাখ্যা করেছিলেন। একই সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো উল্লেখ করে মোহামেডানের পক্ষ থেকে বাফুফেকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। মোহামেডান কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টি তখনই সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না।
কিন্তু বাফুফে বিষয়টিকে সময়মতো গুরুত্ব দেয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতির মাঝেই বাফুফে সভাপতি থাইল্যান্ড সফরে চলে যান। সফর শেষ করে পরশু দিন দেশে ফিরে তিনি গতকাল মোহামেডান কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হন এবং দেখতে পান যে ক্লাবটি নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
নিচে ফেডারেশন কাপের ফাইনাল ভেন্যু নিয়ে চলমান সংকটের মূল তথ্যসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের অবস্থান |
| ফাইনালিস্ট দলসমূহ | মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও বসুন্ধরা কিংস। |
| পূর্বনির্ধারিত ভেন্যু ও তারিখ | বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা (ম্যাচের নির্ধারিত তারিখ: আজ)। |
| মোহামেডানের মূল দাবি | কিংস অ্যারেনার পরিবর্তে যেকোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন। |
| বসুন্ধরা কিংসের অভিযোগ | মোহামেডানের হোম ভেন্যু কুমিল্লা নিয়ে আপত্তি। |
| বাফুফে সভাপতির উদ্যোগ | থাইল্যান্ড সফর থেকে ফিরে মোহামেডানের সাথে জরুরি বৈঠক ও সমঝোতার চেষ্টা। |
দেরিতে হলেও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল উদ্ভূত সংকটের গভীরতা ও এর গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, দুই দলই মাঠে খেলতে আগ্রহী, খেলোয়াড়রা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং সমর্থকরাও একটি ভালো ম্যাচ উপভোগ করার অপেক্ষায় আছেন। তাই দুই ক্লাবের স্বার্থ ও মনরক্ষা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তিনি। সভাপতি আরও স্বীকার করেন যে, বাফুফের উচিত ছিল আরও আগে থেকেই কিছু স্পর্শকাতর ও গুরুতর বিষয় আমলে নেওয়া।
যদিও বাফুফে সভাপতি সেই ‘গুরুতর বিষয়গুলো’ প্রকাশ্যে সুনির্দিষ্ট করেননি, তবে ফেডারেশনের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি—কিংস অ্যারেনায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর মাঠের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও ইস্যুর কারণে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) কাছে বাফুফেকে কয়েক দফায় জরিমানা গুনতে হয়েছিল। ঘরোয়া লিগ ও কাপের ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাফুফে সেসব বিষয়কে যথাসময়ে আমলে না নেওয়ার কারণেই বর্তমান ফেডারেশন কাপের ফাইনালে এই ভেন্যু সংকট এমন জটিল রূপ ধারণ করেছে।