খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের কোনো নির্বাচনি সমঝোতা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন জোটবদ্ধ আন্দোলনের সঙ্গী হলেও এখন একে অপরের বিরুদ্ধে ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন তাঁরা। এই আসনে বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূলত লড়াই হতে যাচ্ছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নাগরিক ঐক্যের প্রার্থীর মধ্যে। এক সময়ের ‘জোট সঙ্গী’ বনাম ‘পুরাতন প্রতিদ্বন্দ্বী’র এই ত্রিমুখী লড়াই নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তজনা সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শিবগঞ্জের পাড়া-মহল্লায় ভোটের ডামাডোল বাজতে শুরু করেছে। এই আসনের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। শুরুতে ঋণখেলাপির অভিযোগে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করলেও উচ্চ আদালতের দারস্থ হয়ে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। এখন তিনি তাঁর নিজস্ব দলীয় প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ কয়েক বছর জোটগতভাবে নির্বাচন করার পর এবার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
বগুড়া-২ আসনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা:
| প্রার্থীর নাম | রাজনৈতিক দল | প্রতীক | রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপট |
| মীর শাহে আলম | বিএনপি | ধানের শীষ | উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়। |
| মাহমুদুর রহমান মান্না | নাগরিক ঐক্য | কেটলি | জোটের সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচন করছেন। |
| মাওলানা শাহাদুজ্জামান | জামায়াতে ইসলামী | দাঁড়িপাল্লা | ১৯৯১ সালের সাবেক সংসদ সদস্য। |
| শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ | জাতীয় পার্টি | লাঙ্গল | বর্তমানে মামলা সংক্রান্ত কারণে আত্মগোপনে আছেন। |
| সেলিম সরকার | গণঅধিকার পরিষদ | ট্রাক | তরুণ ভোটারদের আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। |
| মো. জামাল উদ্দিন | ইসলামী আন্দোলন | হাতপাখা | ধর্মীয় ভোট ব্যাংক সংহত করার চেষ্টা করছেন। |
বগুড়া-২ আসনটি মূলত একটি উপজেলা (শিবগঞ্জ) নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৭ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৩ জন। এছাড়াও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার রয়েছেন ৫ জন।
মাহমুদুর রহমান মান্নার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন সময় বড় দলগুলোর সমর্থনে লড়েও বিজয়ী হতে পারেননি। ১৯৯১ সালে তিনি জনতা মুক্তি পার্টি থেকে পেয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ১৮০ ভোট। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী হয়ে তিনি যথাক্রমে ১৯ হাজার ৮৭১ এবং ৩৬ হাজার ৭৫০ ভোট পান। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ নিয়ে তিনি সর্বোচ্চ ৬২ হাজার ৩৯৩ ভোট পেয়েছিলেন। তবে এবার জোট না থাকায় তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার আসল পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
নাগরিক ঐক্যের স্থানীয় নেতাদের দাবি, বিএনপি তাঁদের অবমূল্যায়ন করেছে। জোটের কথা বলে শেষ মুহূর্তে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় মান্না এখন একক লড়াইয়ে নেমেছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মান্না নিজেই জোট থেকে সরে গেছেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময় জোটবদ্ধ থাকার পর এবার বিএনপি ‘জোটের অভিশাপ’ মুক্ত হয়ে এককভাবে লড়ছে এবং ভোটাররা তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে ধানের শীষকেই বেছে নেবে।
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদুজ্জামান তাঁর ১৯৯১ সালের এমপি থাকাকালীন উন্নয়নের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তবে আওয়ামী লীগ আমলের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় বর্তমানে এলাকাছাড়া, যা নির্বাচনি ময়দানে তাঁর অবস্থানকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।
বগুড়া-২ আসনে এখন ভোটের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় নেতৃত্ব বনাম হেভিওয়েট জাতীয় ব্যক্তিত্ব। মীর শাহে আলমের স্থানীয় তৃণমূল শক্তি, মাহমুদুর রহমান মান্নার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং মাওলানা শাহাদুজ্জামানের নিজস্ব ভোট ব্যাংক—এই তিনের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। শিবগঞ্জের সাধারণ ভোটাররা এখন মুখিয়ে আছেন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য।