এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 18শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ২ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল যে হাত ধরে, তিনি হীরালাল সেন—বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় অথচ অবিস্মরণীয় এক অধ্যায়ের মহান রচয়িতা। তিনি ছিলেন শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেরই নয়, সমগ্র এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা অঞ্চলেরও অন্যতম প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাতা।
চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী নাম হীরালাল সেন—একজন স্বপ্নবান পথিক, যাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বাঙালির ‘রূপালী পর্দায়’ গল্প বলা।
জন্ম ও শৈশব
১৮৬৬ সালের ২ আগস্ট, মানিকগঞ্জ জেলার বকজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হীরালাল সেন। পিতা চন্দ্রমোহন সেন, মাতা বিধুমুখী দেবী। পিতামহ গোকুলকৃষ্ণ মুনশি ছিলেন ঢাকার প্রখ্যাত আইনজীবী, পরে কলকাতা হাইকোর্টেও সুনাম কুড়ান। আট ভাই-বোনের মধ্যে হীরালাল ছিলেন দ্বিতীয়।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মানিকগঞ্জ মাইনর স্কুলে। সেই সময়েই তিনি ফারসি ভাষাও শেখেন। ১৮৭৯ সালে ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে বাবার সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে কলেজ জীবনেই তাঁর মনে দানা বাঁধে এক নতুন প্রেম-চলচ্চিত্রের প্রেম, যা একসময় তাঁকে চিরকালের জন্য শিল্পের সঙ্গে জুড়ে দেয়।
পথচলার শুরু
১৮৯৮ সালে কলকাতার স্টার থিয়েটারে প্রদর্শিত হয় স্টিভেনসনের একটি সিনেমা—“The Flower of Persia”। সেই অপেরার একটি নৃত্যদৃশ্য নিয়েই হীরালাল সেন তৈরি করেন তাঁর প্রথম সিনেমা—“A Dancing Scene From the Opera, The Flower of Persia”।
স্টিভেনসনের ক্যামেরা ধার করে শুরু হয় যাত্রা। পরে ভাই মতিলালের সহায়তায় তিনি লন্ডনের ওয়ারউইক ট্রেডিং কোম্পানি থেকে একটি Urban Bioscope কিনে নেন এবং ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি—ভারতের অন্যতম প্রাচীন চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান।
অগ্রণী নির্মাতা
হীরালাল সেন ছিলেন ভারতের প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা, এবং প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের কৃতিত্বও তাঁর। ১৯০৯ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন “The Royal Bengal Vagabond”—বাংলা সাহিত্যের উপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র।
তার সৃষ্টিশীল কর্মজীবন বিস্তৃত ছিল ১৯১৩ সাল পর্যন্ত, যার মধ্যে তিনি নির্মাণ করেন ৪০টিরও বেশি চলচ্চিত্র। অধিকাংশ ছবিতেই তিনি ধারণ করেন কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের নাটকের দৃশ্য। সেই সময় বিদেশ থেকে এনে ব্যবহৃত হতো চলচ্চিত্র ফিল্ম।
গবেষক সৈকত আসগর, প্রভাত মুখোপাধ্যায়, কালীশ মুখোপাধ্যায়, সজল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের গবেষণায় জানা যায়, হীরালাল সেনের নির্মিত সিনেমার সংখ্যা ছিল অন্তত ৫৫টি, যার মধ্যে রয়েছে তথ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য, বিজ্ঞাপন এবং রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।
পরিণতি ও অমরতা
১৯১৭ সালে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর তৈরি প্রায় সব চলচ্চিত্র পুড়ে যায়—এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি। সেই বছরই, ২৯ অক্টোবর, তিনি চিরতরে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে।
চিরস্মরণীয়
হীরালাল সেন ছিলেন সাহসী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক, যিনি যান্ত্রিক পর্দায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একশ বছর আগে। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বাঙালির চলচ্চিত্র স্বপ্ন—গল্পে, আবেগে, আলো-ছায়ার বিন্যাসে।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি এই মহান পথিকৃৎকে।
বাংলা চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল সেনকে জানাই অতল ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমএজেড