খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
রমজান মাস ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। রাজধানীর প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ এখনো পুরোপুরি পর্যাপ্ত নয়, তবে গত কয়েক দিনের তীব্র সংকট কাটিয়ে ক্রেতারা এখন সহজেই তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। গত সোমবার দিবাগত রাত থেকে বড় বড় বিপণনকারী কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে শুরু করেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট এবং চন্দ্রিমা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলজাত তেল দৃশ্যমান। মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার কাঁচাবাজারে পুষ্টি, তীর ও গৃহিণী ব্র্যান্ডের বোতলজাত তেল নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ বাড়লেও তা এখনো চাহিদার তুলনায় অর্ধেক। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ১ ও ২ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও ৫ লিটারের বড় বোতলের সংকট এখনো কাটেনি।
নিচে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভোজ্যতেলের বর্তমান মূল্য ও পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| পণ্যের ধরণ | বর্তমান খুচরা মূল্য (লিটার) | গত সপ্তাহের মূল্য (লিটার) | বর্তমান বাজার পরিস্থিতি |
| বোতলজাত সয়াবিন | ১৯৫ – ২০০ টাকা | ১৯২ – ১৯৫ টাকা | সরবরাহ বাড়ছে, তবে অপর্যাপ্ত |
| খোলা সয়াবিন | ১৯৮ – ২০০ টাকা | ১৯৩ – ১৯৫ টাকা | ড্রাম প্রতি ৪০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে |
| খোলা পাম অয়েল | ১৬৫ – ১৭০ টাকা | ১৬০ – ১৬৫ টাকা | মোটামুটি স্থিতিশীল |
| ২ লিটার বোতল | ৪০০ টাকা (ব্র্যান্ডভেদে) | ৩৯০ – ৩৯৫ টাকা | গায়ের দামেই বিক্রি হচ্ছে |
ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সয়াবিন তেলের এই সাময়িক সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ‘আতঙ্কিত কেনাকাটা’ বা অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতা দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, রমজান মাসে তেলের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে কোনো কোনো পর্যায়ে সরবরাহে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।
বিক্রমপুর জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোতাহার হোসেন জানান, অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ তেল কিনে রাখছেন, যা কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করছে। এছাড়া পাইকারি বাজারে খোলা তেলের ড্রাম প্রতি দাম প্রায় ৪০০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে লিটার প্রতি ৪-৫ টাকা দাম বেড়েছে।
ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স’ সম্প্রতি বাণিজ্য সচিবকে এক চিঠির মাধ্যমে তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। এমনকি ভাড়ায় চালিত ট্রাক বা লরি পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কোম্পানিগুলোর দাবি, বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি তেলের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, রাজধানীর বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ গত সপ্তাহের তুলনায় সন্তোষজনক হলেও খুচরা বিক্রেতারা এখনো দৈনিক চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাচ্ছেন। সরকারি তদারকি বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ভোজ্যতেলের বাজার পূর্ণ স্থিতিশীলতায় ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ভোক্তাদের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা অযৌক্তিক মজুতদারি পরিহার করেন।