খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: 22শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৭ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাতব্যথা সারে এমন কুসংস্কারে শিয়াল শিকার ও মাংস বিক্রি এখনও চলছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানি পূর্ব বাজারে ‘দুলাল মাংস বিতান’ নামের একটি দোকানে বিক্রি হচ্ছিল শিয়ালের মাংস।খবর পেয়ে ৩ অক্টোবর সেখানে অভিযান চালায় বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১৫ কেজি শিয়ালের মাংস।
অভিযানকারীরা জানিয়েছেন, দুর্বৃত্তরা ছয়টি শিয়াল ধরেছিল। এর মধ্যে চারটিকে হত্যা করেছে। বাকি দুটি শিয়াল জীবিত উদ্ধার করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলে গত দুই মাসে ১২টি অভিযানে ৬০ কেজি শিয়ালের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে।
নোয়াখালীভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অ্যানিমেল রাইট বিডি-৬৪’-এর প্রতিষ্ঠাতা রাইমন চৌধুরী রনিম গণমাধ্যমকে বলেন, শিয়ালের মাংস ও তেল বাতব্যথা দূর করে বলে একটা বিশ্বাস কারও কারও মধ্যে আছে। নোয়াখালীতেও অনেকে এটা বিশ্বাস করেন। এ কারণে শিকারিরা গোপনে শিয়াল শিকার করে মাংস বিক্রি করেন। প্রতি কেজি মাংসের দাম আড়াই হাজার টাকার আশপাশে।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ অনুযায়ী, শিয়াল তফসিল-২-ভুক্ত প্রাণী। মানে হলো, শিয়াল রক্ষিত বন্য প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত।
আইনে রক্ষিত বন্য প্রাণী নিধনের শাস্তির বিষয়ে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স গ্রহণ না করে কোনো বন্য প্রাণী বা বন্য প্রাণীর কোনো অংশ বা মাংস সংরক্ষণ করলে দণ্ড হিসেবে এক বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁটুর ব্যথা, বাতব্যথা ও হাঁপানি রোগ সেরে ওঠে—এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তারপরও শিয়াল মেরে মাংস কেনাবেচা হয়।
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিক বলেন, ফাঁদ পেতে ধরা শিয়াল একেকটি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় কিনে নেয় কিছু লোক। এরপর কিছু কিছু মাংসের দোকানে শিয়ালের মাংস বিক্রি হয়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে শিয়াল হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৪৭টি। গত দুই মাসে নোয়াখালীতে শিয়াল হত্যার ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৫টি। এর মধ্যে ৪টি মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
কী বলছেন চিকিৎসকেরা
গেঁটে বাত (গাউট) এবং পুরোনো ও দীর্ঘস্থায়ী গ্রন্থিবাতে (রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস) ভুগছেন দেশের বহু মানুষ। তবে তাঁদের সংখ্যা কত, সে বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
২০২৪ সালে জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ল্যানসেটে’ প্রকাশিত দুটি নিবন্ধ থেকে জানা যায়, দেশে গেঁটে বাতের রোগীর সংখ্যা ৫ লাখ ৬৫ হাজার।
জ্বালাময় বা দাহযুক্ত বাতই হচ্ছে গেঁটে বাত। এর ফলে এক বা একাধিক অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয়, লালচে ভাব হয় এবং ওই সব স্থানে গরম অনুভূত হয়। নারীর চেয়ে পুরুষের এ রোগ বেশি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়ে। ঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না নিলে পরিস্থিতি জটিল হয়, মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হয়। পুরোনো ও দীর্ঘস্থায়ী গ্রন্থিবাতে ভুগছেন ২ লাখ ১২ হাজার মানুষ।
এ রোগে অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়, অস্থিসন্ধি ফুলে যায় এবং কখনো কখনো অস্থিসন্ধি শক্ত ও অনমনীয় হয়ে যায়। এ ধরনের বাতে শরীরের যেকোনো অস্থিসন্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ সমস্যা শুরু হয় সাধারণত হাত ও পায়ের বিভিন্ন সন্ধি থেকে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিউমাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু শাহিন গণমাধ্যমকে বলেন, শিয়ালের মাংস খেলে বা তেল ব্যবহার করলে বাতব্যথা দূর হয়—গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের বিশ্বাস আগে অনেক বেশি ছিল। এখন কমে আসছে। কারণ, চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার হারও বাড়ছে।
অধ্যাপক আবু শাহিন বলেন, শিয়ালের তেল ও মাংস খেয়ে বাত সারানোর চেষ্টা করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। নিরাপদ হচ্ছে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া।
বাত সারাতে কবিরাজি চিকিৎসা এ অঞ্চলের অনেক দেশেই প্রচলিত আছে। তবে এর কার্যকারিতার প্রমাণ নেই। যেমন ভারতের ওডিশায় শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেলে বাতব্যথা কমে কি না, তা নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল। ২০২০ সালে প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম ‘ইউজ অব অ্যানিমেল অ্যান্ড অ্যানিমেল প্রোডাক্টস ফর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ট্রিটমেন্ট: অ্যান এক্সপ্লোরেটিভ স্টাডি ইন ওডিশা, ইন্ডিয়া’।
১১৩ জন রোগীর ওপর করা ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেলে বাতব্যথা কমে, এমন প্রমাণ তারা পায়নি।
খবরওয়ালা/এসআর