বাবার দণ্ডে বিতর্কে হংকং আইন

হংকং, ১১ ফেব্রুয়ারি — হংকংয়ের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৬৯ বছর বয়সী কোক ইয়িন-সাংকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ভঙ্গের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। অভিযোগ, তিনি তার কন্যা আনা কোকের নামে থাকা একটি জীবনবীমা পলিসি বাতিল করে সঞ্চিত অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করেন। আদালতের এই রায় দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োগ ও তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, কোক ইয়িন-সাং তার কন্যার প্রায় দুই বছর বয়সে একটি জীবনবীমা পলিসি গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই পলিসি বাতিল করে ৮৮,৬০৯ হংকং ডলার (প্রায় ১১,৩৪২ মার্কিন ডলার) উত্তোলনের উদ্যোগ নেন। প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি, আনা কোক বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত এবং জাতীয় নিরাপত্তা পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘পলাতক’ কর্মী। ফলে তার নামে থাকা সম্পদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই মামলা হংকংয়ের “আর্টিকেল ২৩” বাস্তবায়নের পর প্রথমদিকের উল্লেখযোগ্য নজিরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর্টিকেল ২৩, যা বেইজিং-প্রণীত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের সম্প্রসারণ হিসেবে প্রণীত, রাষ্ট্রদ্রোহ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পলাতক হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তির সম্পদ ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ আইনটির “স্পষ্ট লঙ্ঘন”।

অন্যদিকে, আনা কোক ওয়াশিংটনভিত্তিক হংকং ডেমোক্রেসি কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বীমা পলিসির মালিকানা তার ছিল না এবং তিনি কখনো বাবার কাছ থেকে অর্থ দাবি বা গ্রহণ করেননি। তার বক্তব্য, “আজ আমার বাবা কেবল আমার পিতা হওয়ার কারণে দণ্ডিত হলেন।” হংকং পুলিশ তার গ্রেপ্তারের জন্য ১০ লাখ হংকং ডলার (প্রায় ১,২৭,৪০০ মার্কিন ডলার) পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

প্রতিরক্ষা আইনজীবী স্টিভেন কোয়ান আদালতে যুক্তি দেন, অভিযুক্তের উদ্দেশ্য ছিল নিজের সঞ্চিত অর্থ ফেরত নেওয়া; তিনি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন। কোক ইয়িন-সাং দোষ স্বীকার করেননি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে সাক্ষ্যও দেননি। আদালত তার জামিন অবিলম্বে বাতিল করে এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে ২৬ ফেব্রুয়ারি। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড হতে পারে, যদিও সংশ্লিষ্ট ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন মন্তব্য করেন, “শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পরিবারের সদস্যকে শাস্তি দেওয়া সামগ্রিক শাস্তির শামিল, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।” আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, এই ধরনের মামলা পারিবারিক সম্পর্ককে আইনি ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এবং ন্যায়বিচারের পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে সরকারপক্ষের সমর্থকদের যুক্তি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগে কঠোরতা অপরিহার্য।

নিচে মামলার মূল তথ্যসংক্ষেপ দেওয়া হলো—

বিষয় বিবরণ
অভিযুক্ত কোক ইয়িন-সাং (৬৯)
অভিযোগ জাতীয় নিরাপত্তা আইনে সম্পদে পরোক্ষ হস্তক্ষেপ
অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা ৮৮,৬০৯ HKD (~১১,৩৪২ USD)
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আনা কোক (বিদেশে অবস্থানরত)
ঘোষিত পুরস্কার ১০ লাখ HKD
সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সাজা ৭ বছর (ম্যাজিস্ট্রেটে সর্বোচ্চ ২ বছর)
পরবর্তী শুনানি ২৬ ফেব্রুয়ারি

এই রায় হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগের পরিধি ও তার সামাজিক অভিঘাত নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। সমর্থকরা এটিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন, আর সমালোচকদের মতে, এর ফলে নাগরিক স্বাধীনতা ও পারিবারিক সুরক্ষা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।