খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে চৈত্র ১৪৩২ | ৩০ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে উৎসবমুখর প্রস্তুতি চললেও, এর আড়ালে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন দেশে যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাওয়া এই বৃহৎ ক্রীড়া আসরকে কেন্দ্র করে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শক থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দা—অনেকেই সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি হতে পারেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশদ প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, বিশ্বকাপকে ‘নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আনন্দঘন’ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আয়োজকদের পক্ষ থেকে গুরুতর ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি আয়োজক দেশেই আলাদা আলাদা মানবাধিকার সংকট বিদ্যমান, যা বিশ্বকাপ চলাকালীন আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
| দেশ | প্রধান উদ্বেগ | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | কঠোর অভিবাসন নীতি, গণগ্রেপ্তার | বিদেশি সমর্থক ও অভিবাসীদের নিরাপত্তাহীনতা |
| মেক্সিকো | সহিংসতা দমনে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি | সাধারণ নাগরিক ও পর্যটকদের ঝুঁকি বৃদ্ধি |
| কানাডা | গৃহহীনদের জন্য সেবা বন্ধ | সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক সংকট |
মেক্সিকোতে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রায় এক লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে কানাডার টরন্টোতে গৃহহীনদের জন্য চালু থাকা একটি শীতকালীন আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৭৮টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে দেশটির পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যামনেস্টি অভিযোগ করেছে, সেখানে অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে ‘আধা সামরিক অভিযান’-এর মতো, যেখানে মাস্ক পরিহিত সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে গণগ্রেপ্তার ও আটক করা হচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে দেশান্তর করা হয়েছে। এই সংখ্যা বিশ্বকাপ ফাইনালের সম্ভাব্য দর্শকসংখ্যার তুলনায় বহু গুণ বেশি, যা একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
এছাড়া কিছু শহরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতামূলক চুক্তি জাতিগত প্রোফাইলিং ও বৈষম্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে নতুন কিছু কঠোর শর্ত আরোপের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা পেতে প্রায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নিরাপত্তা জামানত জমা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই নীতি ইতোমধ্যে ৫০টি দেশের ওপর কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে।
এর ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ও উন্নয়নশীল দেশের সমর্থকদের জন্য বিশ্বকাপ সরাসরি উপভোগ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণসহ ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
অভিযোগের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, বিশ্বকাপকে নিরাপদ ও সফল করতে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। একাধিক সংস্থা সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক দর্শক, খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অ্যামনেস্টির মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়—এটি বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক। তাই এই আয়োজনকে ঘিরে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন গ্রহণযোগ্য নয়। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্য থাকলেও, এর বিনিময়ে সমর্থক, শ্রমিক, সাংবাদিক বা স্থানীয় জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।
সবশেষে, তারা আহ্বান জানিয়েছে—বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিটি ধাপে মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে ফুটবলের এই মহোৎসব সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।