খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা আসন্ন বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের মান উন্নয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করতে উন্নত আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটেড) অফসাইড প্রযুক্তি চালু করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। ফুটবল মাঠে প্রায়শই দেখা যায়, কোনো খেলোয়াড় অফসাইড হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সহকারী রেফারি বা লাইনসম্যান পতাকা তোলেন। এই বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট জটিলতা ও বিতর্ক এড়াতেই ফিফা এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদের (ভিএআর) সহায়তা নিয়ে মাঠের অফিশিয়ালরা অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন এবং লাইনসম্যানরা তাৎক্ষণিকভাবে পতাকা তুলতে পারবেন।
নতুন এই প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক সংকেত প্রেরণের ক্ষমতা। ম্যাচ চলাকালীন কোনো খেলোয়াড় যদি ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড পজিশনে থাকেন, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাঠের সহকারী রেফারির কাছে একটি অডিও অ্যালার্ট বা সংকেত চলে যাবে। এর আগে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে এই প্রযুক্তির প্রাথমিক সংস্করণগুলো পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে পূর্ববর্তী সেই সংস্করণগুলোতে কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি অফসাইড থাকলে অফিশিয়ালদের কাছে সংকেত পাঠানো হতো। নতুন সংস্করণে এই সীমানা কমিয়ে ১০ সেন্টিমিটারে আনা হয়েছে, যা প্রযুক্তির কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন ঘটলেও ফুটবলের মূল নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে মানুষের হাতেই। কখন অফসাইডের পতাকা তুলতে হবে এবং খেলা থামাতে হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা মাঠের অফিশিয়াল বা রেফারির হাতেই ন্যস্ত থাকবে। কারিগরি বা প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটির সন্দেহ দেখা দিলে রেফারিরা পতাকা না তোলার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। যেকোনো ধরনের ভুল এড়াতে ফিফা এই প্রযুক্তিতে বেশ কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বা ‘সেফগার্ড’ যুক্ত করেছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির কিছু সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্মতম বা গাঘেঁষা (মার্জিনাল) অফসাইডগুলো পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারবে না। এ ছাড়া খেলোয়াড়েরা যদি মাঠে পড়ে থাকেন কিংবা বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় খুব কাছাকাছি অবস্থানে জটলা পাকিয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি নিখুঁতভাবে কাজ করতে সমস্যায় পড়তে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিটি শুধু খেলোয়াড়ের পজিশন বা অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে অফসাইড নির্ধারণ করতে সক্ষম। বল স্পর্শ না করেও একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে বাধা দিচ্ছেন কি না—এমন ব্যাখ্যামূলক ও মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্তগুলো রেফারিকেই নিতে হবে।
ফিফা আশা প্রকাশ করেছে যে, এই প্রযুক্তির ব্যবহারে সমর্থক ও খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিনের হতাশা অনেকটাই দূর হবে। অফসাইডের বাঁশি বাজার আগে অযথা খেলা চালিয়ে যাওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের গুরুতর চোট পাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। উদাহরণস্বরূপ, গত ২০২৫ সালের মে মাসে নটিংহাম ফরেস্টের স্ট্রাইকার তাইও আওনিয়ি মাঠের সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তুলতে দেরি করার কারণে গোলপোস্টের সঙ্গে মারাত্মকভাবে ধাক্কা খান এবং একপর্যায়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন। নতুন প্রযুক্তির দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে শতভাগ নিখুঁত করতে ফিফা প্রতিটি খেলোয়াড়ের হুবহু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত (এআই) ‘থ্রিডি অবতার’ বা ডিজিটাল রূপ তৈরি করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আসন্ন বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দলের প্রতিটিতে ২৬ জন করে খেলোয়াড় থাকবেন। অর্থাৎ, সর্বমোট ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকেরই একটি করে ডিজিটাল স্ক্যান করা হবে।
এই স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার জন্য প্রতিটি খেলোয়াড়কে একটি বিশেষ চেম্বার বা কক্ষে প্রবেশ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে মাত্র এক সেকেন্ড সময় লাগবে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অফিশিয়াল ফটোশুটের সময়েই মাত্র একবার এই স্ক্যান করা হবে। এর ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্তগুলো স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিন এবং টেলিভিশন দর্শকদের জন্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিখুঁত থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে প্রদর্শন করা সম্ভব হবে।
অফসাইডের পাশাপাশি গোল হওয়ার আগমুহূর্তে বল মাঠের দাগ বা টাচলাইন পেরিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিল কি না, তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করার প্রযুক্তি ব্যবহারেরও অনুমোদন দিয়েছে ফিফা। বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে অ্যাস্টন ভিলার একটি গোল বাতিল নিয়ে ফুটবল বিশ্বে চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বলটি মাঠের বাইরে চলে গিয়েছিল কি না, তা খালি চোখে স্পষ্ট বোঝা না যাওয়ার কারণেই সেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
নতুন এই প্রযুক্তির আওতায় এখন থেকে গোললাইন প্রযুক্তির মতোই একটি ‘থ্রিডি অ্যানিমেশন’ তৈরি করা হবে, যা বলের একেবারে নিখুঁত অবস্থান ফুটিয়ে তুলবে। পাশাপাশি বলের ভেতরে একটি বিশেষ ইলেকট্রনিক চিপ স্থাপন করা থাকবে। এই চিপের মাধ্যমে জানা যাবে কোন খেলোয়াড় বলটি সর্বশেষ স্পর্শ করেছিলেন। এর ফলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিরা (ভিএআর) তাঁদের নতুন ক্ষমতার অংশ হিসেবে কর্নারের সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল কি না, তা সহজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন।
নতুন প্রযুক্তি এবং পূর্ববর্তী সংস্করণের মধ্যে কার্যকর পার্থক্যের একটি তুলনামূলক বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের বিবরণ | পূর্ববর্তী সংস্করণ (ক্লাব ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ) | নতুন সংস্করণ (আসন্ন বিশ্বকাপ) |
| অফসাইড শনাক্তকরণের সীমা | ৫০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি। | ১০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি। |
| সংকেত পাঠানোর মাধ্যম | অফিশিয়ালদের কাছে ডিজিটাল সংকেত। | সহকারী রেফারির কাছে রিয়েল-টাইম অডিও অ্যালার্ট। |
| অ্যানিমেশন ও প্রদর্শন ব্যবস্থা | সাধারণ ভিজ্যুয়াল ট্র্যাকিং। | এআই চালিত থ্রিডি অবতার ও উন্নত অ্যানিমেশন। |
| বলের অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তি | সীমাবদ্ধ ও খালি চোখের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। | অভ্যন্তরীণ চিপ ও গোললাইনের মতো থ্রিডি অ্যানিমেশন। |
| খেলোয়াড় স্ক্যানিং | বাধ্যতামূলক সুনির্দিষ্ট থ্রিডি ডাটাবেস ছিল না। | ৪৮ দলের ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ওয়ান-সেকেন্ড স্ক্যান। |