খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে চৈত্র ১৪৩২ | ২৭ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্বব্যাপী বীমা খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল রূপান্তর এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এখন ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, বীমা খাতের সিইওরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও সাইবার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক আশাবাদী অবস্থানে রয়েছেন।
KPMG International-এর “২০২৫ ইন্স্যুরেন্স সিইও আউটলুক” প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ সিইও তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। যা ২০২৪ সালের ৭৪ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সঙ্গে ৭৮ শতাংশ সিইও পুরো বীমা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে বীমা খাতে এআই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ অগ্রাধিকারগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ সিইও এআইকে শীর্ষ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, তারা তাদের মোট বাজেটের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ রাখতে চান এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন এবং জেনারেটিভ এআইয়ের জন্য।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিনিয়োগ থেকে দ্রুত রিটার্নের প্রত্যাশা বাড়ছে। প্রায় ৬৭ শতাংশ সিইও মনে করেন, আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যেই এআই বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুফল পাওয়া যাবে—যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ২১ শতাংশ।
যদিও সম্ভাবনা উজ্জ্বল, তবুও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশ সিইও আগামী তিন বছরে সাইবার অপরাধকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি দক্ষ জনবলের ঘাটতি এআই বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—৮৩ শতাংশ সিইও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
| বিষয় | শতাংশ (%) |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধিতে আত্মবিশ্বাসী সিইও | ৮২% |
| শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী | ৭৮% |
| এআইকে শীর্ষ বিনিয়োগ অগ্রাধিকার | ৭৩% |
| এআইয়ে ১০-২০% বাজেট বরাদ্দের পরিকল্পনা | ৬৭% |
| ১–৩ বছরে এআই থেকে রিটার্ন প্রত্যাশা | ৬৭% |
| সাইবার ঝুঁকিকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখছেন | ৮৩% |
| দক্ষতার ঘাটতি উল্লেখ করেছেন | ৮৩% |
| নিয়ন্ত্রক বাধার আশঙ্কা | ৭৭% |
বীমা খাতে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (M&A) কার্যক্রমও আগামী বছরগুলোতে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় অর্ধেক সিইও উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন চুক্তির প্রত্যাশা করছেন, আর ৪১ শতাংশ মাঝারি পর্যায়ের চুক্তি বাড়বে বলে মনে করছেন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা ও সংহতি আরও বাড়বে।
সাসটেইনেবিলিটি বা টেকসই উন্নয়ন এখন বীমা ব্যবসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রমে টেকসই নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে ৮১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের ESG (পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন) রিপোর্টিং উন্নত করেছে এবং ৭৭ শতাংশ জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ জোরদার করেছে।
ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেখানে বীমা প্রিমিয়ামের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, সুরক্ষা ও অবসরকালীন পণ্যের বাড়তি চাহিদা এবং দ্রুত ডিজিটাল গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্ডাররাইটিং, দাবি নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকসেবায় এআইয়ের ব্যবহার ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
বীমা কোম্পানিগুলো এখন পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসে পূর্ণাঙ্গ এআই বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নত করা, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, দ্রুত ক্লেইম প্রসেসিং এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বীমা খাত এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর যুগে প্রবেশ করেছে। এআই, ডেটা এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাচ্ছে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত ডেটা অবকাঠামো এবং কার্যকর নীতিনিয়ন্ত্রণ কাঠামো। আগামী কয়েক বছরেই বোঝা যাবে, এই বিপুল বিনিয়োগ কতটা বাস্তব ফল এনে দিতে সক্ষম হয়।