ড. মীজানুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
১৯০০ এর দশকের মহামন্দার ছবি নিখুঁতভাবে এঁকেছেন ১৯৬২ সালে নোবেল বিজয়ী আমেরিকান লেখক জন স্টেইনবেক (১৯০২-১৯৬৮) তাঁর “The Grapes of Wrath’ (১৯০৯) উপন্যাসে। যেখানে রুটি-রোজির সন্ধানে মানুষের যাযাবর জীবনের কাহিনী মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে। কর্মহীন মানুষের এই অসহায়ত্ব ও দ্রোহের রূপ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন,’… How can you frighten a man whose hunger is not only in his cramped stornach but in the wretched bellies of his children? You cann’t scare him he has known a fear beyond every other.” বেকারত্ব মানুষকে কেবল জীবিকাহীন করে না, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আদিমকাল থেকে মানুষ কর্মের মাঝে সার্থকতা খুঁজছে, কর্মহীন ব্যক্তি তাই এক জীবন্ত লাশ। এই চরম মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে যুগ যুগ ধরে সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টির প্রধান উপজীব্য করেছেন। ভিক্টোরিয়া যুগের ইংল্যান্ডের দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাব ফুটে উঠেছে চার্লস ডিকেন্সের ‘অলিভার টুইস্ট’ ও ‘ডেভিড কপারফিল্ড উপন্যাসে। ফ্রাঞ্জ কাফকা’র ‘দ্যা মেটামরফোসিস’ বা আলবেয়ার কামুর ” The Stranger-এ কর্মহীন, উদ্দেশ্যহীন মানুষের যে চরম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ, তা প্রকারান্তরে বেকারত্বেরই এক মনস্তাত্ত্বিক রূপ।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে ভবঘুরেপনা থাকলেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি বা ‘পুতুল নাচের ইতিকতা’য় অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মহীনতার নগ্ন রূপ স্পষ্ট। ভাঙ্গনাক্রান্ত জমিদার ও গ্রামীণ সমাজে যুবকদের বেকার হয়ে পড়ার ট্রাজেডি ফুটে উঠেছে তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণের লেখায়। দেশভাগের পরবর্তী কলকাতার বেকার যুবকদের হতাশা ও ক্ষোভের শ্রেষ্ঠ দলিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি’ এবং সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’।
যেখানে বেকারত্ব যুবসমাজকে বিপ্লব অথবা অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ এবং সমরেশ মজুমদারের উপন্যাসগুলোতে দেখা যায় কিভাবে বেকারত্ব যুবসমাজকে এক অন্তহীন শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়। চাকরির বাজারে ব্যর্থ হয়ে মধ্যবিত্ত যুবকের এই অস্তিত্বের সংকটের কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই তাঁর “আমি কিরকম ভাবে বেঁচে আছি’ কবিতায় তুলে ধরেছেন এইভাবে-
‘চাকরির বাজারে ব্যর্থ হয়ে, বিকেলের দিকে ট্রামের লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছি,
আমি কি বাঁচতে চেয়েছিলাম”।
সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং জনঅরণ্য সিনেমায় সত্তর দশকের কলকাতার চাকরিপ্রার্থী যুবকের ইন্টারভিউ বোর্ডের অপমান, হতাশা ও নৈতিক স্খস্খলনের চিত্র কালজয়ী হয়ে আছে। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায় বেকারত্বের কারণে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙ্গন এবং ‘নীতা’ চরিত্রের ট্রাজেডি আজও দাগ কাটে। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমায় চাকরিপ্রার্থী যুবকের ইন্টারভিউ বোর্ডের যে অপমান ও নির্মমতার চিত্র দেখা যায় তারই কাব্যিক রূপ মেলে কবি সমর সেনের কবিতায়।
তিনি লিখেছেন-
“ক্লান্ত চরণে ট্রাম থেকে নামি,
পকেটে রেস্তোরাঁর বিল আর ভবিষ্যতের শূন্যতা।
ইন্টারভিউ বোর্ডের বাবুদের চোখে
আমি এক বাতিল পুতুল।”
বেকারত্বের অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য যুবসমাজের আকুতি ও তীব্র দ্রোহের প্রকাশ ঘটেছে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায়। তিনি সূর্যের কাছে প্রার্থনা করেছেন বাঁচার ন্যূনতম অধিকারের জন্য-
“হে সূর্য! তুমি আমাদের উত্তাপ দাও, আমরা শুনেছি তুমি দানশীল।
আমাদের স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে, এই বেকারত্বের অন্ধকারে,
একটু আলো দাও, একটু বাঁচার অধিকার দাও’।
বেকারত্ব কেবল ক্যারিয়ার ধ্বংস করে না, তা কেড়ে নেয় মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও ভালোবাসার মানুষটিকেও। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় এই সামাজিক সত্যটি অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে-
‘চাকরি পেলেই তোমাকে বিয়ে করব-
এই মিথ্যে সান্ত্বনায় কেটে গেছে পাঁচটি বছর। এখন আমার পকেটে শুধু এক টুকরো বেকারত্বের সার্টিফিকেট,
আর বুকে এক সমুদ্র হাহাকার।”
বেকারত্ব কেবল পকেটের শূন্যতা তৈরি করে না, এটি মানুষের অস্তিত্বের এক নীরব সংকট। স্রোতহীন নদী যেমন স্থবির ও পঙ্কিল, কর্মহীন জীবনও ঠিক তেমনি এক বদ্ধ জলাশয়। বেকারত্ব কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, একটি সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু। প্রতিদিন হাজারো তরুণ তাদের সোনালী সকালগুলোকে বিক্রি করতে চায় ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য, একটু নিশ্চিত ভবিষ্যতের খোঁজে, কিন্তু দিনশেষে ঘরে ফেরে কেবলই শূন্যতা নিয়ে। রাষ্ট্র যখন কর্মের যোগান দিতে ব্যর্থ হয় তখন মেধা পরিণত হয় বোঝায়। বেকারত্ব কোনভাবেই অলসতার ফসল নয়, এটা মেধার অপচয় এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব, যা তরুণদের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়।
চলমান অর্থনৈতিক সংকটে নতুন চাকরি হচ্ছে না বললেই চলে, আবার অনেকের চাকরি চলেও যাচ্ছে। এ দায় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি অথবা শিক্ষার মানকে দেয়া উচিত নয়। কারণ কর্মসংস্থান আর্থ-সামাজিক অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। এই অঞ্চলের মানসম্মত শিক্ষা অর্জনকারী ও মেধাবীদের বেকার থাকার গল্প নতুন নয়। বরিশালে জন্মগ্রহণকারী অক্সফোর্ডের ইতিহাসবিদ ড. তপন রায় চৌধুরী (১৯২৬-২০১৪) তাঁর ‘বাঙালনামা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘বিশ এবং ত্রিশের দশকে (১৯১০-০০) বেকার সমস্যা কি ভয়াবহ ছিল তা আমাদের স্মৃতি থেকে প্রায় মুছে গেছে। বিএ এবং এমএ তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েও অর্থনীতিবিদ ড. ভবতোষ দত্ত প্রায় সাত-আট বছর বেকার ছিলেন। নীরদ চৌধরী মশায়ের জীবনের বেশ ক’বছর কেটেছে দৈনিক এক টাকা রোজগারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী (১৯২৮-২০১৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ রেজাল্ট করেও চাকরি না পেয়ে প্রতিবাদস্বরূপ জুতা পলিশের কাজ শুরু করেছিলেন। ইংরেজ শাসনের প্রায় শেষের দিকেও এদেশে বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য কতটা ভয়াবহ ছিল তা দেখা যায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবনের দিকে তাকালে। বেকারত্ব এড়াতে নজরুল মক্তবের শিক্ষকতা, মাজারের খাদেমগিরি, এবং লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে শৈশবেই জীবিকা খুঁজতে বাধ্য হন। মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহারা কবি আসানসোলের একটি রুটির দোকানে মাসে মাত্র ১ টাকা বা সামান্য খাবারের বিনিময়ে রুটি বানানোর কাজ নেন। পরবর্তী জীবনেও কলকাতার বিভিন্ন সম্ভা মেসে ও ডেরায় বেকার অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। যেখানে অনেক সময় এক বেলা খাবারও জুটত না। কবি-জীবনের বড় একটা সময় বিভিন্ন প্রকাশক ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতেন। টাকার অভাবে স্ত্রী প্রমিলা দেবীর সঠিক চিকিৎসা করাতে পারেননি। ১৯৪২ সালে যখন কবি নিজে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন তখনও তার নিকট চিকিৎসা চালানোর মত কোন সঞ্চয় বা স্থায়ী আয় ছিল না। অনেকটা আর্থিক অনটন ও বেকারত্বের কারণেই নজরুল প্রায় আড়াই বছর (১৯১৭-২৯২০), সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক পদে চাকরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বাংলাদেশে কেবল শিক্ষিত ও যোগ্য হওয়াই চাকরি পাওয়ার একমাত্র ও পর্যাপ্ত শর্ত নয়। শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে তোলে সত্য, কিন্তু দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য চাই উপযুক্ত ক্ষেত্র। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং সুশাসনের অভাব থাকলে শিক্ষার মানোন্নয়ন কেবলই “সোনার পাথরবাটি”। কর্মসংস্থানের বাজার না বাড়িয়ে শিক্ষার সার্টিফিকেট বিতরণ করা হলে সেটা হবে তরুণদের হাতে তলোয়ার দিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার সমান।
শিক্ষার মান বাড়লে দক্ষ শ্রমিকের যোগান হয়তো বাড়বে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়লে দক্ষ এবং অদক্ষ উভয়কেই বেকার বসে থাকতে হবে। কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ালে যা হবে তাকে অর্থনীতির ভাষায় এটাকে ‘এলিট আনএমপ্লয়মেন্ট’ বা উচ্চমানের বেকারত্ব বলা হয় । বিশ্বমানের ডিগ্রিধারী ও অতি দক্ষ তরুণরা বেকার থাকবে এবং নিচু পদের চাকরি (underemployment) করতে বাধ্য হবে। শিক্ষার মান বাড়ানোর বিপুল ব্যয় ভোগ করবে উন্নত বিশ্ব । আমাদের বৈদেশিক আয়ের দ্বিতীয় বড় উৎস রেমিটেন্স হলেও, এটা আসে কমশিক্ষিত এবং অদক্ষ শ্রমিকদের পরিশ্রমে। উচ্চ ডিগ্রি এবং উচ্চমানের দক্ষতা নিয়ে যারা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে তাদের অল্প সংখ্যকেই দেশের রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। বেশিরভাগই তাদের মা-বাবা এবং পরিবারের সদস্যদেরকে সেদেশে নিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের সম্পত্তি বিক্রি করে টাকাও আমেরিকায় কানাডার মতো উন্নত দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকা এবং কানাডা থেকে যে রেমিটেন্স আসে সেটাও আসে কম শিক্ষিত ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মতো আধা-দক্ষ শ্রমিকদের কাইক পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত আয় থাকে।
দেশে চাকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষিত ও যোগ্য হওয়ায় চাকরি পাওয়ার জন্য একমাত্র বা পর্যাপ্ত শর্ত নয়, সর্বত্রই রয়েছে স্বজনপ্রীতি ও রেফারেন্স সংস্কৃতির আধিপত্য। এমনকি বেসরকারি খাতের কথিত উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও রেফারেন্স বা মামা-চাচার জোর বেশি প্রাধান্য পায়, ফলে যোগ্য প্রার্থী ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ পায় না। কোটা প্রথা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে, এবং সবশেষে ঘুষ না দিতে পারায় যোগ্য প্রার্থীদের মন ভেঙ্গে যায়। মেধা তালিকার শীর্ষে থেকেও অনেকে বাদ পড়ে যায়। শিক্ষার সাথে চাকরি বাজারেরর প্রয়োজনীয় দক্ষতার অসামঞ্জস্য থাকার কারণে সর্বোচ্চ সিজিপিএ পাওয়া প্রার্থীও বর্তমানে কর্পোরেট বাজারের জন্য যোগ্য নাও হতে পারে। বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যার সমাধানের যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী অনেক নিয়োগকর্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। অভিজ্ঞতা বলে এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে তরুণরা চাকরি পাচ্ছে না, আবার শিল্পও যোগ্যতাসম্পন্ন লোক নিয়োগ করতে পারছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষেও তরুণরা লাইব্রেরীতে বা ইন্টারভিউ বোর্ডে জুতা ক্ষয় করছে । যুব সমাজের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় এত বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সহিংসতার অন্যতম কারণ হচ্ছে বেকারত্ব থেকে সৃষ্ট স্থানান্তরিত ক্রোধ। যেমনটা বলেছিলেন আলজেরিয়ান বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক Frantz Fanon তাঁর “Black Skin, White Mask’ (1952) শীর্ষক বইয়ে দীর্ঘ চাপ, অবদমন, অসম্মান ও নির্যাতনের মধ্যে থাকলে সমাজে হিংসা বেড়ে যায় । মানুষ যখন মূল কারণে হাত দিতে পারে না বা খুঁজে পায় না, তখন সে চারপাশের ওপর আক্রোশ বোধ করে’। এটাকে বলা হয় স্থানান্তরিত ক্রোধ (transfered aggression), আর স্থানান্তরিত ক্রোধের লক্ষ্যবস্তু সবসময়ই হয় নিরীহ ও দুর্বল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান (নারী, শিশু, সংখ্যালঘু এবং তাদের উপাসনালয়)। ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়িক শক্তিগুলো আমজনতার ক্রোধকে স্থানান্তরিত করে ঐসব দুর্বল জায়গায় পাঠিয়ে দেয়। আক্রান্ত হয় মন্দির, পূজা মন্ডপ, জেলেপাড়া, মাজার, খানকা, সংগীত, সিনেমা ও লালনের আখড়া। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ডিগ্রিধারী (সনদদারী!) বেকারদের দীর্ঘশ্বাস এবং সেটাকে ব্যবহার করার রাজনৈতিক কূটচাল। অনেকে মনে করেন জুলাই ২৪ এর সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিকল্পনাকারীরা মানুষের স্থানান্তরিত ক্রোধকে ব্যবহার করেছিলেন।
পরিসংখ্যানের শুষ্ক কাগজের আড়ালে লুকিয়ে থাকে লাখো তরুণের স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। বাংলাদেশের বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অনেক ধীর। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রম বাজারে এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছে . এর বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭লাখ। যার অর্থ, প্রায় পঞ্চাশ লাখ তরুণ কর্মহীন থেকে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্যোগ করোনা মহামারী এবং মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাবে, যারা চাকরি করতো তাদের অনেকেরই আবার চাকরি চলে গেছে। দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার হচ্ছে ৪.৪৮%। কিন্তু স্নাতকোত্তর ও স্নাতক সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আইএলও এবং ‘স্ট্যাটিস্টা’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী তরুণ সমাজ (১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী)-এর মধ্যে প্রায় ১২.৪% বেকার। ‘স্কিল মিসম্যাচ’ এর কারণে এক তৃতীয়াংশ গ্র্যাজুয়েট তিন চার বছর পর্যন্ত বেকার থাকে। যাদের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা এখন ০২ বছর করা হয়েছে। যদিও ২৫/২৬ বয়সে স্নাতক পাস করা নতুন চাকরিপ্রার্থীদের তুলনায় বয়স্ক চাকরি প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায়মূলক পরীক্ষায় ভালো করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যুব শক্তির ১৯.৫৪ শতাংশ বা ৫৫ লাখের মতো বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় (NEET- Not in Education, Employment or Training)। তারা পড়াশোনা করছে না আবার কর্মসংস্থানের খোঁজও ছেড়ে দিয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি অপেক্ষমান টাইম বোম। তাদের অর্জিত ডিগ্রি এখন কেবলই কাগজের টুকরো। বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার দিকে। যুবকদের বিশাল অংশ হতাশাগ্রস্ত এবং কেউ কেউ নেশাগ্রস্থও।
সামাজিক ও পারিবারিক নিগ্রহের দহন সহ্য করতে না পেরে অনেক মেধাবী প্রাণ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। অনেকে মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়ছে, কেউ গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে আর কেউ ইউরোপের পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে ডুবে মরছে। তাদের পকেটে পাওয়া যায় শুধু বেকারত্বের সার্টিফিকেট।
এই সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? দেশে বিরাজমান বাস্তবায় এটা নিশ্চিত করে বলা যায় সরকার যত চেষ্টাই করুক, খুব দ্রুত ব্যাপক কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না। টাকার অঙ্কে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। বিনিয়োগের স্থবিরতা সহসা কেটে যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। আপাতত বেকারদের নিজের কর্মসংস্থান নিজেকেই করতে হবে, এমনকি ইচ্ছে না থাকলেও। এদের হতেহবে ‘অনন্যোপায় উদ্যোক্তা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক Robert Rairly চাকরি দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় ব্যবসায় শুরু করাকে অনন্যোপায় উদ্যোক্তা বা ঠেকায় পড়ে উদ্যোক্তা (Necessity Entrepreneurship) হিসেবে অবহিত করেছেন। নির্দিষ্ট বেতনে নিরাপদ চাকরির সুযোগ না থাকাই এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হওয়ার অন্যতম প্রেরণা। তবে এসব উদ্যোক্তার অনেকের মনে হয়তো শ্রমিক (বেতনভুক্ত কর্মচারী) না হয়ে মালিক হওয়ার সুপ্ত বাসনা ছিল। আর যারা সদ্য চাকরি হারিয়েছেন তারাতো তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরেছেন, বড় শ্রমিক (বেশি বেতনের চাকরি) হওয়ার চেয়ে ছোট মালিক হওয়া অনেক ভালো; স্বাধীনভাবে কাজ করা যায়, আত্মমর্যাদা ও স্বকীয়তা নিয়ে থাকা যায়, নিজের সৃজনশীলতাকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি, ইত্যাদি। যারা কিছুদিন চাকরি করে চাকরি হারিয়েছেন তাদের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতাও হয়েছে, এটা কাজে লাগাতে চায়। বিদেশে অনেকেই কৃষি খামারে কাজ করে দেশে ফিরে এসে পশুপালন, মৎস্য খামার, ফল চাষ, গরু-ছাগল ও বেড়ার খামার, হাঁসের খামার, টার্কিশ বা উট পাখির খামার, এমনকি খেজুর বা ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে তুলেছে। যারা বিভিন্ন দেশে হোটেল রেস্টুরেন্টে কাজ করে ফেরত এসেছেন তারা নিজ এলাকায় বা শহরে রেস্টুরেন্ট খুলেছেন । যার মাথায় যে অভিজ্ঞতা বা ধারণা ছিল সেটা নিয়েই নিজের ব্যবসা নামার চেষ্টা করছে। এদের সবাই ব্যবসায় টিকে থাকবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এদের মধ্যে অনেকেই সফল ব্যবসায়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে ক্ষুদ্র পর্যায়ে আত্মকর্মসংস্থান সাময়িকভাবে বেকারত্ব দূর করলেও ব্যাপক বেকারত্ব দূরীকরণে শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। সবাই ইচ্ছে করলেই উদ্যোক্তা হতেও পারবে না। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বিশেষ গুণাবলীর প্রয়োজন। বিধাতা সবাইকে ভালো উদ্যোক্তা হওয়ার যোগ্যতা দেন না, কিছু মানুষকে যোগ্য শ্রমিক হওয়ার জন্যই হয়তো সৃষ্টি করেছেন। বেকারদের মধ্য থেকে বাছাই করে কাউকে কাউকে উদ্যোক্তা হওয়ার, আর বাকিদের ভালো দক্ষ শ্রমিক হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে আমাদের কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারিত হলেও এর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেকেই আবার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পেয়ে বেকার থেকে যাচ্ছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে দেশে রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়বে। দক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিকদের জন্য বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে দেশে অবস্থানকারী অবশিষ্ট বেকাররা চাকরির সুযোগ পাবে।
– অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়