খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
রাজধানীর জুরাইনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক পাপ্পু শেখ (২৮) পরিবারসহ বসবাস করতেন। সোমবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট পর জুরাইন কনকর্ড স্কুলের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আহত হন আরও একজন। নিহতের পরিবার জানায়, স্থানীয় কানা জব্বারের ছেলে বাপ্পা, কানচি ও আরও কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। কয়েকদিন আগে বাপ্পার ভাতিজা হিমেলের সঙ্গে পাপ্পুর ঝগড়ার জের ধরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবার ধারণা করছে। র্যাব-১০ ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে রবিবার খুলনা মহানগর ও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে মামলায় হাজিরা দিয়ে মোটরসাইকেলে বসে থাকা হাসিব হাওলাদার (৪০) ও ফজলে রাব্বি রাজনকে (৩৫) মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা দুজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের সহযোগী ছিলেন। হত্যাকারীরা শুধু গুলি করেই থামে না, যাওয়ার সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে নগরীর আরেক সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
শুধু জুরাইন ও খুলনা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা বেড়েছে। সন্ত্রাসীরা আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা কারণে গুলি করে হত্যা করছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে। আদালতপাড়া মতো নিরাপদ এলাকায় হত্যাকাণ্ড জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। গত মাসে ঢাকার আদালতপাড়ায়ও এক সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি থাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা বাড়ছে। গণ-অভ্যুত্থান ৫ই আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশি দুর্বলতায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই সময় বিভিন্ন থানায় হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা লুট করে পুলিশের অস্ত্র। এছাড়া গণভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় থাকা এসএসএফ সদস্যদের অস্ত্রও লুট হয়। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের থানা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৭৫০টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪০৮টি উদ্ধার হলেও হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো নিখোঁজ। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এসএমজি, অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ও এলএমজি রয়েছে। গোলাবারুদও লুট হয়েছিল, যা পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসী, জঙ্গি, চরমপন্থি ও জেল পলাতকদের হাতে চলে গেছে। এছাড়া দেশের সীমান্ত দিয়ে অন্তত ১৮ থেকে ৩০টি পয়েন্ট হয়ে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। নজরদারি বেড়ে গেলে চোরাচালানকারীরা রুট বদলে ফেলে।
সাম্প্রতিক হত্যার মধ্যে রয়েছে—১১ই নভেম্বর পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা; ১৫ই নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম নিহত; রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতাকে হত্যা; ১৭ই নভেম্বর পল্লবীতে হার্ডওয়্যার দোকানে প্রবেশ করে পল্লবী থানার সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা; এর আগের মাসে চট্টগ্রামে দিনদুপুরে বিএনপি সমর্থিত এক ব্যবসায়ীকে হত্যা।
গোয়েন্দা তথ্য জানায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া ইমন ব্যাংকক থেকে ঢাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ঘাঁটি থেকে। জোসেফ আন্ডারওয়ার্ল্ডে সরব। সানজিদুল ইসলাম ইমন মালয়েশিয়া থেকে ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও হাজারীবাগে সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করছেন। পিচ্চি হেলাল মোহাম্মদপুর এলাকায় বাহিনী পরিচালনা করছিলেন, তবে তিনি দেশ ছাড়ায় নিয়ন্ত্রণ গেছে ইমনের হাতে। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর মামুন এলাকায় দাপট চালাতেন। ক্লাবপাড়া, মতিঝিল, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করছে জিসান গ্রুপ।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, একই ধরনের অপরাধ बारবার ঘটলে বুঝতে হবে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর নয়। সন্ত্রাসীরা ভয় পাচ্ছে না, নিয়ন্ত্রণেও ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, তিন কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে—লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া, বাতিলকৃত লাইসেন্সধারী অস্ত্র জমা না দেওয়া ও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ। এছাড়া কারাগার ভেঙে পালানো ও জামিনে মুক্ত সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি নেই। প্রকাশ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দ্বিধায় থাকে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া সন্ত্রাসী দমন সম্ভব নয়।
খবরওয়ালা /এসএস