খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
গত ২৯ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত বৈশ্বিক বীমা খাতে এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সামনে এসেছে। সামুদ্রিক বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, আন্ডাররাইটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত ব্যবহার, বিলাসবহুল ঘড়ি চুরি ও হারানোর দাবি বৃদ্ধি, দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার পূর্বাভাস, ভারতে হোম লোন বীমার চাহিদা বৃদ্ধি এবং সিঙ্গাপুরে পারিবারিক দায়িত্বের কারণে আর্থিক পরিকল্পনায় বিলম্ব—সব মিলিয়ে বিশ্ব বীমা শিল্পে নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও সামুদ্রিক বীমা সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে জাহাজ ও পণ্যের বীমার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। এর ফলে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনায় প্রিমিয়াম সমন্বয় করছে।
অ্যালিয়াঞ্জ রিসার্চের সেফটি অ্যান্ড শিপিং রিভিউ ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১ হাজার ১৫০টি কার্গো জাহাজ স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ গ্রস টন পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক বীমা খাত—উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে বীমা কোম্পানিগুলো দ্রুত আন্ডাররাইটিং কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রিমিয়ামের ওপর চাপের কারণে পরিচালন ব্যয় কমানো ও ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও নির্ভুল করতে এআইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সোলার্স কনসালটিংয়ের এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি পাঁচটি বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি আন্ডাররাইটিং বিভাগে এআই ব্যবহার করছে। দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এই বিভাগে এখন প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে।
অন্যদিকে বিলাসবহুল ঘড়ি হারানো ও চুরির ঘটনায় বীমা দাবির সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে এশিয়ায়। দ্য ওয়াচ রেজিস্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, গত তিন বছরে এশিয়ায় এ ধরনের দাবির পরিমাণ গড়ে ২১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী এই হার ছিল ১৭ শতাংশ। জরিপে এশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের ১০০ জন বীমা ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নকারী এবং দাবি ব্যবস্থাপকের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা খাত নিয়েও ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে ফিচ রেটিংস। সংস্থাটির মতে, উচ্চ সুদের হার বীমা কোম্পানিগুলোর মূলধন অবস্থান ও মুনাফা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়ার পাশাপাশি দায়-সম্পর্কিত চাপও কিছুটা কমবে। যদিও স্বল্পমেয়াদে কিছু অবাস্তবায়িত বিনিয়োগ ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো, তবুও সামগ্রিক আর্থিক ভিত্তি আগের তুলনায় শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতে গত পাঁচ মাসে হোম লোন বীমার গ্রহণযোগ্যতা সাত গুণ বেড়েছে। ঋণগ্রহীতারা এখন ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সুরক্ষিত করতে আগ্রহী হচ্ছেন। এই পরিবর্তন ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পলিসিবাজারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের মোট হোম লোন বীমা পলিসির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই বিক্রি হচ্ছে মেট্রো শহরগুলোতে। এর মধ্যে দিল্লি-এনসিআর অঞ্চল সবচেয়ে এগিয়ে, যেখানে মোট বিক্রির ৮ থেকে ১০ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে। এরপর রয়েছে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, লখনউ ও পুনে।
সবশেষে, সিঙ্গাপুরে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের কারণে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অবসর-পরবর্তী জীবন এবং বীমা পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। ম্যানুলাইফের এশিয়া কেয়ার সার্ভে ২০২৬-এ অংশ নেওয়া ১ হাজার ৭৪ জনের মধ্যে ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করছেন। তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশের মতে, এই দায়িত্ব ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বীমা শিল্প এখন একযোগে কয়েকটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বীমার ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও দক্ষ করে তুলছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের আচরণ, ব্যক্তিগত সম্পদের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার ধরণেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বীমা বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।