খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিগত কয়েক বছরে বিশ্বসংগীতের মঞ্চে দক্ষিণ এশীয় দেশ পাকিস্তানের সংগীত এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি থেকে শুরু করে আধুনিক পপ কিংবা হিপ-হপ—সবক্ষেত্রেই পাকিস্তানি শিল্পীরা আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রসারের ফলে দেশটির সুর ও তালের বৈশ্বিক ব্যাপ্তি এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সংগীতের এই জয়যাত্রা এখন কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ইউরোপ ও আমেরিকার মূলধারার চার্টগুলোতেও জায়গা করে নিয়েছে।
স্পটিফাইয়ের (Spotify) সাম্প্রতিক ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে পাকিস্তানি গানের আন্তর্জাতিক রপ্তানি বা বৈদেশিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর হার অবিশ্বাস্যভাবে ৬২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বিশ্ববাজারে দেশটির সাংস্কৃতিক প্রভাবের একটি স্পষ্ট নির্দেশক। এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে কোক স্টুডিও পাকিস্তানের ‘পাসুরি’ (Pasoori) গানটি। আলী শেঠি ও শায় গিলের গাওয়া এই গানটি স্পটিফাই গ্লোবাল ভাইরাল ফিফটি তালিকায় শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং আধুনিক পাকিস্তানি সংগীতের বৈশ্বিক আইকন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য অনুসারে, পাকিস্তানি গানের সিংহভাগ শ্রোতাই এখন দেশটির সীমানার বাইরে অবস্থান করছেন। নিচে বিভিন্ন সংগীত ঘরানার বৈশ্বিক শ্রোতাদের একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| সংগীতের ঘরানা | পাকিস্তানের বাইরের শ্রোতা (%) |
| পাঞ্জাবি পপ ও কাওয়ালি | ৮৯% |
| পাঞ্জাবি হিপ-হপ | ৮৮% |
| দেশি পপ | ৮৭% |
| গজল ও ভাংরা | ৮৪% |
এই সারণী থেকে স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সুফি ও কাওয়ালি সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক পপ ও হিপ-হপ ঘরানাও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমভাবে সমাদৃত।
পাকিস্তানি সংগীতের এই বৈশ্বিক পরিচিতি হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। নব্বইয়ের দশকে কিংবদন্তি নুসরাত ফতেহ আলী খান পিটার গ্যাব্রিয়েল কিংবা এডি ভেডারের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের সঙ্গে কাজ করে পশ্চিমা বিশ্বে কাওয়ালির পরিচিতি এনে দিয়েছিলেন। তারও আগে আশির দশকে নাজিয়া হাসানের ‘ডিসকো দিওয়ানে’ অ্যালবামটি ১৪টি দেশের চার্টে শীর্ষস্থান দখল করেছিল।
বর্তমানে সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন আরুজ আফতাবের মতো শিল্পীরা। আরুজ আফতাব প্রথম পাকিস্তানি শিল্পী হিসেবে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জয় করে বিশ্বমঞ্চে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। অন্যদিকে, আলী শেঠি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে পশ্চিমা ইলেকট্রনিক সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে গজলকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে তুলেছেন। তার এই অনন্য সৃজনশীলতা তাকে হার্ভার্ড বা কার্নেগি হলের মতো আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে জায়গা করে দিয়েছে।
পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক মানের ফিউশন। জেইন মালিকের সঙ্গে পাকিস্তানি ব্যান্ড ‘এ ইউ আর’-এর ‘তু হ্যায় কাহাঁ’ গানটি বিশ্বব্যাপী মিলিয়ন মিলিয়ন স্ট্রিমিং অর্জন করেছে। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ‘কোচেলা’ (Coachella) উৎসবে আলী শেঠির সরাসরি পরিবেশনা প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সংগীত এখন কেবল ইন্টারনেটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বের বড় বড় উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানি সংগীতের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে তাদের সুরের গভীরতা এবং সমসাময়িক বাদ্যযন্ত্রের সঠিক ব্যবহার। লাহোর বা করাচির অলিগলি থেকে শুরু হওয়া এই সুরের ঢেউ আজ লন্ডন, নিউ ইয়র্ক কিংবা দুবাইয়ের ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির জন্য এক বড় অর্জন।