খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম (সোফি স্টেডিয়াম) স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের লাল ও সাদার মিশ্রিত রঙে সেজেছিল। বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আয়োজক দেশটি নিজেদের ঘরের মাঠের ফুটবল সমর্থকদের বিন্দুমাত্র নিরাশ করেনি। মাঠের লড়াইয়ে এক দাপুটে ও আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে তারা লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে। এই গৌরবময় জয়ের মধ্য দিয়েই স্বাগতিক দল টুর্নামেন্টে তাদের শুভ সূচনা নিশ্চিত করল।
দীর্ঘ সময় পর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের পর আবারও ফুটবল বিশ্বকাপ ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। এবার নিজেদের চেনা পরিবেশে বৈশ্বিক এই মেগা ইভেন্টে অনেক বড় লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে মার্কিন পরাশক্তিরা। দলের পক্ষে ফোলারিন বালোগুনের চমৎকার জোড়া গোল এবং জিওভান্নি রেইনার দৃষ্টিনন্দন এক গোলের উপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্র এই বড় ব্যবধানের জয় তুলে নেয়। ম্যাচের অন্য গোলটি এসেছে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডারের আত্মঘাতী অবদানের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম নতুন করে লিখল মার্কিন ছেলেরা; কারণ বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এবারই প্রথম তারা চার গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করল।
নিম্নে উক্ত ম্যাচের গোল ও দলগত পারফরম্যান্সের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিবরণ | যুক্তরাষ্ট্র | প্যারাগুয়ে |
| চূড়ান্ত ফলাফল (গোল) | ৪ | ১ |
| প্রথমার্ধের ফলাফল | ৩-০ | ০-০ |
| প্রথম গোলের সময় ও ধরণ | ৭ম মিনিট (আত্মঘাতী) | ৭৩তম মিনিট (স্বাভাবিক) |
| সর্বোচ্চ গোলদাতা | ফোলারিন বালোগুন (২টি গোল) | মরিসিও (১টি গোল) |
| খেলোয়াড় পরিবর্তন সংখ্যা | ৩ জন | ৪ জন |
| হলুদ কার্ড প্রাপ্তি | ১টি | ৫টি |
বিগত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে চার ম্যাচ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট গোলের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনটি। তাছাড়া এই ঐতিহাসিক ম্যাচের পূর্বে তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো একটি একক ম্যাচে কখনোই তিন গোলের বেশি করতে সমর্থ হয়নি। তবে নতুন প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর সৃজনশীল, আধুনিক ও আক্রমণাত্মক কৌশল যেন দলটিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ৭০,৪৯২ জন ফুটবল প্রেমী দর্শকের সামনে এক ভিন্ন রূপে এবং নতুন উদ্দীপনায় মাঠে ধরা দিয়েছে এই দলটি।
ম্যাচের প্রথমার্ধে দুর্দান্ত প্লেমেকিং বা আক্রমণ ভাগের সমন্বয় গড়ে একটি চমৎকার অ্যাসিস্ট করেন ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলগত কারণে কিংবা চোটের সতর্কতাস্বরূপ তাকে আর মাঠে নামানো হয়নি। তিনি কোনো চোট পেয়েছেন কি না সেই বিষয়ে অবশ্য তাৎক্ষণিক নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। তবে খেলা চলাকালীন গ্যালারিতে থাকা নিজের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে তিনি ইশারায় ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন যে তিনি ভালো আছেন। প্রথমার্ধের বিরতির সময় পুলিসিচের পরিবর্তে মাঠে প্রবেশ করেন সেবাস্তিয়ান বারহাল্টার।
মার্কিনিদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে প্যারাগুয়ে রক্ষণভাগ শুরু থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলের বিশাল লিড বা ব্যবধান তৈরি করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে দলটির সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়ের রেকর্ড।
খেলার শুরুর মাত্র সাত মিনিটে পুলিসিচের তৈরি করা একটি বিপজ্জনক আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার ড্যামিয়ান বোবাডিল্যার পায়ে লেগে বল আত্মঘাতী গোল হিসেবে জালে জড়ায়। এর ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিক দেশ। এরপর ম্যাচের ৩১তম মিনিটে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ গোল সম্পন্ন করেন ফোলারিন বালোগুন। প্রথমার্ধের নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষে অতিরিক্ত বা যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে (৪৫+৫ মিনিটে) নিজের এবং দলের পক্ষে আরো একটি গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন তিনি। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এবং লন্ডনে শৈশব কাটানো এই ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই জোড়া গোল করার গৌরব অর্জন করলেন। ১৯৩০ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো মার্কিন ফুটবলারের এক ম্যাচে একাধিক গোল করার ঘটনা এটিই প্রথম।
উল্লেখ্য যে, তিন বছর আগে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার পথ এবং সম্ভাবনা পরিত্যাগ করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিলেন মোনাকোর এই ফরোয়ার্ড। নিজের অভিষেক ম্যাচেই এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি মার্কিন দলের দীর্ঘদিনের স্ট্রাইকার বা ফরোয়ার্ড সংকটের একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সমাধানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন।
পুলিসিচ প্রথমার্ধের পর মাঠ ছাড়ার দরুন দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ছন্দ হারালেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। ম্যাচের ৭৩তম মিনিটে প্যারাগুয়ের বদলি খেলোয়াড় প্রাদো মরিসিও একটি গোল করে ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে ৩-১ এ নিয়ে আসেন। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে (৯০+৭ মিনিটে) দলের পক্ষে চতুর্থ গোলটি করেন জিওভান্নি রেইনা। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের ভেতরে ঢুকে চমৎকার এক টো-ফ্লিকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি সম্পন্ন করেন এবং দলের ৪-১ ব্যবধানের এই বিশাল জয় নিশ্চিত করেন। কাতার বিশ্বকাপে সাবেক কোচ গ্রেগ বারহাল্টারকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে রেইনা খেলার খুব একটা সুযোগ পাননি। ফলে তার জন্য এই গোল এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘন ছিল।