খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের পাহাড় আর অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বোঝা বইতে গিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের সম্ভাব্য মুনাফা ধরে রাখতে পারছে না, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংককে তাদের বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘প্রভিশন’ বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে আলাদা করে রাখতে হয়। ঋণের মানভেদে এই সঞ্চিতির হার ভিন্ন হয়। বিশেষ করে মন্দ বা ক্ষতিকর ঋণের (Bad/Loss) বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাগামহীনভাবে বেড়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। ফলে বিশাল অংকের এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন স্তরে এই ঘাটতির চিত্র ভিন্ন। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেখানে চরম সংকটে, সেখানে বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের প্রভিশন ঘাটতির চিত্র তুলে ধরা হলো:
| ব্যাংকের ধরণ | প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক | ১,২১,২১৪.১৯ |
| রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক | ৭০,৩৬৪.৪৪ |
| বিশেষায়িত ব্যাংক | ২০১.০২ |
| বিদেশি ব্যাংক | ৩৩৮ (উদ্বৃত্ত) |
| মোট ঘাটতি | ১,৯১,৭৮০.০০ |
গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি মনে করেন, এই প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যখন কোনো ব্যাংক প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন তার ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমে যায় এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকে নীতিমালার শিথিলতা, নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই অংক ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও গত বছরের শেষ তিন মাসে আদায় জোরদার ও বিশেষ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে, তবুও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য কঠোর সংস্কার প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতের এই অস্তিত্ব সংকট দূর করতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে আপসহীন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বেনামি ঋণ বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই প্রভিশন ঘাটতির বোঝা আরও বাড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার স্বায়ত্তশাসন ব্যবহার করে ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে কাগুজে মুনাফার পরিবর্তে প্রকৃত আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরে আসে।