নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর
প্রকাশ: 3শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ১৭ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আমাদের ভুতের ভয় ছিল, যদিও এখন মনে করি, ভুত নেই। ভুতের ভয় এখনো আমার মনে ষোল আনা আছে। কেন আছে সেটা অন্য প্রসঙ্গ, তর্ক করা যেতেই পারে। তবে মাঝে মাঝে আমি ভুলে যেতেও চেয়েছি, এখনো ভুলে যেতে ইচ্ছে করে, ভুত নেই। কিন্তু পারিনি, পারি না। কেন পারিনি, ভুত ভুলতে পারি না সেটা নিয়েও তর্ক করা যেতে পারে। আমার মন এখনো প্রশ্ন করে, ভুত কি সত্যি নেই? ভৌতিক কাণ্ড কি এখনো হরহামেশাই ঘটছে না? ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার যে নৈমিত্তিক ঘটছে কার চোখে না পড়ছে? ভুতের আছর থেকে বাঁচার জন্য এখনো আমরা ওঝার কাছে যাই না? যতই শিক্ষিত আর আধুনিক জীবনই যাপন করি না কেন ভুত আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে না এখনো? এখনকার কথা থাক, আগে ছোটবেলার ভুতের কথা বলে নিই।
ছোটো বেলায় ভুতের ভয় দেখা দিত রাতে। রাতের অন্ধকারে একা পথ চলতে গেলে ভুতের ভয়ে গরম কালেও কাঁপতে হতো। রাতে একা বের হতেই চাইতাম না। ঘর থেকে বের হতে চাইতাম না। কিন্তু পায়খানাটাও ছিল পুকুরের অপর পাড়ে। তবে ভয় বেশি পেতাম কবর আর শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়া আসার সময়, সেটা দিনের বেলায়ও। শ্মশান বা কবরস্থানে বড় বট গাছ থাকলে তাতে ভুত থাকবেই নিশ্চিত জানতাম। আরও জানতাম, ভুতেরা এক কবরস্থান বা শ্মশান থেকে ওড়ে গিয়ে অন্য কবরস্থান বা শ্মশানের গাছে গিয়ে আড্ডা দেয়। পথের পাশে বড় বট গাছ বা ঘন ঝোপঝাড় থাকলেও ভুত থাকত।
শেঁওড়াগাছে ভুত থাকে এ কথা কে না জানত? আমাদের কালে ভুতদের দেখা মিলত সাধারণত আঁধার রাতে। রাতে ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে রাখলেও ভুতের নীরব চলাফেরা, খচখচ নড়াচড়া টের পেতাম। আমার পড়ার টেবিলের পাশে যে জানলা ছিল সেটা দিনের বেলায় খুলে রেখেই পড়তাম। বই থেকে প্রায়শই চোখ জানলা দিয়ে বাইরে, দূরে চলে যেত। জানলার পরেই পায়ে চলা পথ, তার পর মাঠের পানি নামার জন্য খাল, খালের ওপাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, মাঠের কোথাও ডোবা, কোথাও কবরস্থান এর পর আবার দূরের গ্রাম। সে গ্রামে কারা থাকে সে কথা মনে পড়ত। তাদের নিয়ে ভাবতামও। দিনে জানলা খুলে রাখলেও রাতে বন্ধ করে দিতাম। সন্ধ্যার পর বন্ধ করতে ভুলে গেলে কবরস্থানের ঝোপঝাড় থেকে ভুতের আগুন জ্বলে উঠতে দেখতাম। আগুন জ্বলেই আবার নিভেও যেত। যদিও চাচা বলতেন ভুত বলে কিছু নেই। কিন্তু চাচার কথা কখনো বিশ্বাস করতাম না। সূর্য উঠলে দিনের আলোতে আর ভুত দেখা যেত না। আলোতে যে ভুত বের হয় না সেটা জানতাম, এখনো জানি। কিন্তু ভুত শেঁওড়াগাছ আর বনে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে পারে, ছদ্মবেশ ধরে থাকতে পারে এসব জানতাম, এখনো ভুলিনি। আমাদের কালে আলোর খুব অভাব ছিল। কেরোসিন ছিল একমাত্র জ্বালানি। গরিব মানুষের ঘরে কুপি জ্বলত টিমটিম করে। কুপির আলোয় নিজের ছায়াকেও ভুত মনে হতো; কেউ কাছে দিয়ে গেলে সলতের রেশা নড়ে আবার স্থির হতো। এমন কি, হারিকেনের সলতে তেল বা বাতাসের ঘাটতির কারণে নড়লেও ভুতের কাণ্ড মনে করতাম।
দেশের কতিপয় শহর ব্যতীত প্রায় সারাদেশের গ্রামগুলো রাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকত এখন আর কেউ বিশ্বাসই করবে না। গ্রামে বিদ্যুতায়ন খুব বেশি আগের ঘটনা নয়। আমরা আশা করে ছিলাম বিদ্যুৎ আসবে। বিদ্যুতের খুঁটি এল, লাইন এল, বিদ্যুৎ এল। সারাদেশই বিদ্যুতায়িত হয়েছে। যদিও আলো থাকে না, আলো কখনো আসে, কখনো যায়; আবার আসে আবার যায়। বিদ্যুৎ আসা যাওয়া আলোর আসা-যাওয়া আমাদের খুব পরিচিত। বিদ্যুৎ এলেও গ্রাম আলোকিত হয়নি। বিদ্যুতায়িত হওয়া আর আলোকিত হওয়া এক কথা নয়, কেউ কেউ এখনো বলে। তুলনা দিতে গিয়ে উদাহরণ দেয়, শিক্ষিত হওয়া আর আলোকিত মানুষ হওয়া যেমন এক নয়। ইদানীং শুনি অন্ধকার নাকি সবখানেই ক্রমশ বাড়ছে। আবার কেউ কেউ বলে তবুও আলো আসবেই। আলো ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না।
ছোটবেলায় রাত নামার আগে আমরা আলো জ্বালাবার প্রস্তুতি নিতাম। হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করতাম। কুপিতে তেল দিতাম। সন্ধ্যার আগে বাতিও জ্বালাতাম। সব ঘরে তবুও আলো জ্বলত না। সব আঁধার দূর হতো না। আজও সব সব ঘরে আলো জ্বলে না। সবখানে আলো পৌঁছায় না। এখনো ভুতের উপদ্রব সর্বত্র দেখতে পাই। সবচাইতে বেশি ভুতের ভয় এখনো আছে মনের ভেতর। সে ভুত আগে তাড়াতে হবে। আগে আলো হৃদয়ে জ্বালাতে হবে। মনের ভুত বাইরের আলোতে দূর হয় না। মানুষের মনের ভুত তাড়াতে আলোকিত মানুষের দরকার হয়। ইচ্ছাশক্তি লাগে, উদ্যোগ লাগে। অনেক আলোর ঝলকানি আছে, তবুও আছে ভুতে বিশ্বাস। মনের ভেতর আলো নেই, ভুতের ভয় আছে। মনে যে ভুত আছে তাকে তাড়াতে হবে আলো জ্বালাতে হবে, সে বোধ এদেশে অধিকাংশেরই নেই। আলো জ্বালাবার বোধ মনে জাগতে হয়, জাগাতেও হয়। আলো জ্বালাতে চাই সৎসাহস, সদিচ্ছা আর স্বদেশপ্রেম।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
খবরওয়ালা/টিএসএন