খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশ যে ভূমিকম্প–ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত, এ বিষয়টি সবাই জানলেও প্রস্তুতি ও কাঠামোগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে—এমন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন দেশের প্রধান স্থপতি, প্রকৌশলী ও দুর্যোগ–বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত হাসপাতাল, সচিবালয়, জেলা প্রশাসন ভবন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কিংবা পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মতো জরুরি সেবার স্থাপনাগুলোকে শক্তিশালী না করলে বড় ধরনের ভূমিকম্পে উদ্ধারব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়বে। তাই এই ধরণের স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে ভবন–স্পেসিফিক সিসমিক মূল্যায়নের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার মতে, কাঠামো সঠিক নিয়মে নকশা ও নির্মাণ হলে বড় ভূমিকম্পেও ভবন দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সমস্যা হয় তদারকি ও নিয়ম ভঙ্গের কারণে। বাংলাদেশে অনেক ভবন নকশা–নির্দেশনা মেনে তৈরি হলেও বাস্তব নির্মাণে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা যায় না—যা বড় ঝুঁকির কারণ।
স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, সচিবালয়, হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসের মতো ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা নিশ্চিত করা এখনই জরুরি। বড় দুর্যোগে এ ধরনের ভবন ধ্বংস হলে রাষ্ট্রযন্ত্রই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তিনি সংকীর্ণ সড়ক সম্প্রসারণ, জরুরি গ্যাসলাইন ভবনের বাইরে নেওয়া, ও মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
জাপানের উদাহরণ দিয়ে প্যাট্রিক ডি রোজারিও বলেন, দুর্যোগ–নিরাপদ ভবন তৈরিতে বিশেষ কোড ও নকশা থাকে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে হাসপাতালের জন্য আলাদা মানদণ্ড দেওয়া আছে, কিন্তু সেগুলো কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা নিয়মিত তদারক করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্নেল তাজুল ইসলাম জানান, প্রতিটি এলাকায় একটি খোলা জায়গা নির্দিষ্ট করা জরুরি, যেখানে মানুষ ভূমিকম্পের মুহূর্তে জড়ো হতে পারে। বর্তমানে ঢাকায় খোলা জায়গার অভাব উদ্ধারকাজকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
রাজউকের প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, “যে পরিমাণ কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ হবে, তা সরানোর মতো সরঞ্জাম কোনো সংস্থার নেই।” তিনি প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে একটি খেলার মাঠ ও একটি ফায়ার স্টেশন রাখার দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ভূমিকম্প–সংক্রান্ত গবেষণা এবং তথ্যভান্ডার অত্যন্ত দুর্বল। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ “আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউট” প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।
হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক গিয়াস উদ্দিন হায়দার জানান, ইমারত নির্মাণ বিধি হালনাগাদের কাজ চলছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়েছে, যা দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের সবার বক্তব্যের সারমর্ম একই—দুর্যোগ ঠেকানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতি শক্তিশালী হলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ কমে। জরুরি সেবা স্থাপনার নিরাপত্তা, সংকীর্ণ সড়ক সম্প্রসারণ, খোলা জায়গা নির্ধারণ, গবেষণা–কেন্দ্র স্থাপন এবং নিয়মিত মহড়া—এসব এখনই বাস্তবায়ন না করা হলে ভবিষ্যৎ ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।