খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সামুদ্রিক বীমা খাত তার স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বীমা সংস্থা (IUMI)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কার্গো, হাল (জাহাজ কাঠামো), দায়বদ্ধতা (লাইবিলিটি) এবং অফশোর জ্বালানি—এই চারটি প্রধান বীমা খাতে এখনো পর্যাপ্ত কভারেজ বিদ্যমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও বীমা কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণভাবে সেবা প্রত্যাহার করেনি। বরং ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী প্রিমিয়াম ও শর্তাবলীতে পরিবর্তন এনে তারা বাণিজ্যিক প্রবাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোতে বীমা সুরক্ষা এখনো কার্যকর রয়েছে।
কার্গো ও হাল বীমা খাত বর্তমানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং চাহিদা বৃদ্ধি এবং উচ্চ ভাড়া (ফ্রেইট রেট) এই স্থিতিশীলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং বন্দরগুলোতে জট বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও সামগ্রিকভাবে বীমা কভারেজের সক্ষমতা বা ‘ক্যাপাসিটি’ উল্লেখযোগ্যভাবে বজায় রয়েছে।
তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। আন্ডাররাইটাররা এখন নির্দিষ্ট ভ্রমণ বা রুটভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ, প্রতিটি যাত্রাকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে করে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজারের স্থিতিশীলতাও বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
অফশোর জ্বালানি খাতেও বীমা কভারেজ অব্যাহত রয়েছে, যদিও এই খাতটি স্বাভাবিকভাবেই অস্থিরতার মধ্যে থাকে। তেল ও গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির জন্য বীমা এখনও সহজলভ্য, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে সহায়ক। এ খাতের স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দায়বদ্ধতা বা লাইবিলিটি বীমা খাতেও মূল কাভারেজ বজায় রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পি অ্যান্ড আই ক্লাবগুলোর (Protection and Indemnity Clubs) প্রধান প্রোগ্রামগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে এবং এগুলো বাতিলযোগ্য নয়। এর ফলে জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীরা এখনো নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা পাচ্ছেন।
তবে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন—নন-পুলেবল ঝুঁকি এবং চার্টারারদের দায়বদ্ধতা এখন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এসব ক্ষেত্রে এককভাবে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
নিচে সামুদ্রিক বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বীমা খাত | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| কার্গো বীমা | স্থিতিশীল, উচ্চ চাহিদা দ্বারা সমর্থিত |
| হাল বীমা | স্থিতিশীল, পর্যাপ্ত কভারেজ বিদ্যমান |
| লাইবিলিটি বীমা | মূল কাভারেজ অপরিবর্তিত, IG প্রোগ্রাম বহাল |
| অফশোর জ্বালানি | ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কভারেজ চালু |
| ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি | কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে নির্ধারণ |
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, সামুদ্রিক বীমা খাত দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, শর্তাবলীর পরিবর্তন এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে তারা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অভিযোজন ক্ষমতাই সামুদ্রিক বীমা শিল্পকে টেকসই রেখেছে। বিশ্ববাণিজ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হওয়ায়, এই খাতের স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও বীমা খাতের এই দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা জোগাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।