মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শ্রমবাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রবাসী কর্মীদের আয় হ্রাস এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা যদি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তাহলে ২০২৬ থেকে ২০২৭ সময়কালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে গেছেন। ফলে এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বর্তমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশগামী শ্রমিকদের যাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে এবং অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আরও জানিয়েছে, প্রবাসী আয়ে ধাক্কা লাগলে তা বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একযোগে চাপ সৃষ্টি হবে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে বৈশ্বিক সংকটের সময় প্রবাসী আয় অনেক ক্ষেত্রে স্থিতিশীল থেকেছে এবং অর্থনীতিকে সহায়তা করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যতিক্রম, কারণ সংকটের কেন্দ্রবিন্দু সেই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত।
নিম্নে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবাসী আয়ের অবদান তুলে ধরা হলো—
| দেশ |
মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবাসী আয়ের অংশ |
| নেপাল |
৮.১ শতাংশ |
| পাকিস্তান |
৫.৬ শতাংশ |
| শ্রীলঙ্কা |
২.৯ শতাংশ |
| বাংলাদেশ |
২.৮ শতাংশ |
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষত যখন আয়ের প্রধান উৎস অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এই অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং এর প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। যদিও পরিস্থিতি সাময়িক বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও অর্থনীতিতে এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস, তা ঝুঁকির মুখে পড়ায় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।