খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৫ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
সকালের শুরুটা কারও কারও জন্য হয়ত শুভ ছিল, কিন্তু কুমিল্লার মুরাদনগরের এক পরিবারের জন্য তা হয়ে উঠেছিল বিভীষিকাময়। মোবাইল ফোন চুরির অপবাদে জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারান মা, ছেলে ও মেয়ে—রোকসানা আক্তার রুবি (৫৫), রাসেল মিয়া (৩৮) ও জোনাকী আক্তার (৩২)।
এমন ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। একের পর এক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এই ভয়াবহ মব সন্ত্রাস। কেউ চোর, কেউ ছিনতাইকারী বা অন্য কোনো অভিযোগের শিকার—তাতে আইন বা আদালত নয়, সরাসরি রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা।
গত রবিবার গাজীপুরে ১৯ বছরের যুবক শ্রমিক হৃদয়কে পিটিয়ে হত্যা করা হয় কারখানার ভেতরে। আর রাজধানীর মুগদায় সম্প্রতি আল আমীন নামে এক তরুণ ছিনতাইকারী সন্দেহে মারা যান গণপিটুনিতে। এমনকি সাবেক সিইসি কে এম নুরুল হুদা, ঢাবি শিক্ষার্থী, ভাস্কর রাসা কিংবা মানসিক প্রতিবন্ধী শামীম হোসেন কেউই রেহাই পাননি জনতার তাণ্ডব থেকে।
মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে ঘটেছে ২৫৩টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা। প্রাণ গেছে অন্তত ১৬৩ জনের, আহত ৩১২ জন। শুধু গত জুনেই ১০ জন প্রাণ হারান, আহত হন ৪৭ জন। অপরাধের অভিযোগে সন্দেহভাজনদের পুলিশে না দিয়ে পিটিয়ে মারা হচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, জানুয়ারি-মে (২০২৫) পর্যন্ত ৭৮ জন নিহত। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির মতে, গত ৯ মাসে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন ১৩১ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং জনগণের সচেতনতা জরুরি। অথচ এই তিনটিরই অভাব রয়েছে।”
আইজিপি বাহারুল আলম স্বীকার করেছেন, “পুলিশের একার পক্ষে মব নিয়ন্ত্রণ কঠিন। এতে সমাজের সবার সম্মিলিত ভূমিকা দরকার।” একইসঙ্গে পুলিশের ওপরও হামলার বিষয়টি মেনে নিয়ে তিনি বলেন, বাধা সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপি বলেছে, “মব সন্ত্রাস কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় নয়।” দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “রাষ্ট্র যদি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে হবে।”
বাম গণতান্ত্রিক জোটও এক যৌথ বিবৃতিতে সরকারের নীরব ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, “মুরাদনগরে মা-ছেলেসহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা এবং নারী-শিশুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা গোটা জাতিকে আতঙ্কিত করেছে।”
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশে বক্তারা বলেন, “মব সন্ত্রাস এখন নতুন আপদ। এটি বন্ধ না হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।”
মিছিল, হেনস্তা, আগুন, হত্যা—সব মিলিয়ে জনজীবন আজ আতঙ্কগ্রস্ত। চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে পর্যন্ত লোকজন মিছিল করে আওয়ামী লীগ নেতাকে খুঁজতে গিয়ে ক্লাবের ফটকে স্লোগান দেয়।
আইনের শাসনের অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মদদে মব সন্ত্রাস যেন এখন বাংলাদেশের অপরিচিত নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। এমন বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রয়োজন শূন্য সহিষ্ণুতা ও শক্ত আইন প্রয়োগ। নইলে এ সমাজ ক্রমেই অন্ধকারের দিকে এগোবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড